প্রশাসন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পার্টি অফিসের দিকে ‘কেবলা’ ঠিক করে ফেলেছেন এবং নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করছেন–এমন অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান দেশে এসেছেন। আমরা দলের পক্ষ থেকে স্বাগত জানিয়েছি। তারপর যেটা দেখলাম, সেটা দেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। দেখলাম, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তারা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা একটি পার্টি অফিসের দিকে তাদের কেবলা ঠিক করে ফেলেছেন। তারা সেখানে নিয়মিত যাচ্ছেন। আমরা মনে করছি, এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।
মঙ্গলবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিগত সময়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলে যে ধরনের ইল প্র্যাকটিস বা অনিয়ম দেখেছি, সেই একই প্রবণতা আবারও দেখা যাচ্ছে এবং তা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আমরা সবসময়ই দেখেছি, প্রশাসনের ঝোক ক্ষমতাসীনদের প্রতি থাকে। কিন্তু ক্ষমতাসীন হওয়ার আগে এই ধরনের ধৃষ্টতা আমরা কোনোভাবে মেনে নেব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারকে এবং নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানাব যে, যারা সেখানে গিয়েছেন তারা স্পষ্টভাবে তাদের সরকারি চাকরির বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আগামী নির্বাচনে জনরায় দেওয়ার এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করার যে উৎসাহ ছিল সেই উৎসাহেও ভাটা পড়েছে এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে।’
আমরা সরকারকে আহ্বান জানাব, যারা সেখানে গিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তি ব্যবস্থা নেন এবং এটা জনগণের কাছে নিশ্চিত করা যে জনগণের ভোটাধিকার দেওয়ার জন্য এখনো সুযোগ বাকি আছে, এখনো আপনাদের মধ্যে কোনো সেটেলমেন্ট হয়ে যায়নি। এই কনফিডেন্সটা আপনাদের আনতে হবে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘যখন রাস্তায় বের হলে মানুষ জিজ্ঞেস করে ভাই নির্বাচন হবে কি না। আমি মনে করি যে, এটা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা। এখন পর্যন্ত মানুষকে কনফিডেন্স তারা দিতে পারেননি, নির্বাচন হবে কি হবে না। এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে শঙ্কা আছে। যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে শঙ্কা থাকে, তখন মানুষ আসলে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ পান না।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘অনেক এলাকায় এখনো সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পরদিন আমাদের সহযোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। প্রতিটি থানার কাছে সন্ত্রাসীদের তথ্য রয়েছে–সেগুলো কাজে লাগিয়ে দ্রুত গ্রেপ্তার অভিযান চালাতে হবে, নয়তো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’
নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি আপেক্ষিক বিষয়। নির্বাচন শেষে বলা যাবে কমিশন কতটা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছে। তবে এখন পর্যন্ত আচরণবিধি লঙ্ঘন, পোস্টার ঝুলানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রার্থীদের উপস্থিতি–এসব দেখে আমরা পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছি না। কমিশনকে কাজের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।’
জামায়াতের সঙ্গে প্রথমে ৩০টি আসনের বিষয়ে নেগোসিয়েশন হলেও এখন ১০টি আসনের কথা শোনা যাচ্ছে–এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের রিউমারে কান দেবেন না। আমাদের আলোচনা এখনো চলমান আছে। জোটের পক্ষ থেকে আপনাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।’
আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা দেখতে চাই। কিন্তু যদি দেখা যায়, আবারও একটি পাতানো নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা চলছে; তাহলে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত ভোটাধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে রাজপথে নামব।’
‘আমরা চাই একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই দায়িত্বের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। নেতৃত্ব তাদের দিতে হবে। আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, কিন্তু কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা গোপন সমঝোতা মেনে নেব না’, যোগ করেন আসিফ মাহমুদ।
এনসিপির এই মুখপাত্র বলেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ের সময় আমরা বিভিন্ন জায়গায় একাধিক বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা লক্ষ্য করেছি। বিশেষ করে যে ৪৫টি আসনে আমরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি এবং এর বাইরেও আরও যেসব জায়গায় যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এসব বিষয়ে জরুরি ও বিধিসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি।’
‘সামনে যেহেতু আপিল শুনানি রয়েছে, সেখানে যেন কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা একতরফা আচরণ না দেখা যায়–এই বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আমরা কমিশনে এসেছি। আমাদের সব ফরমাল কনসার্ন লিখিতভাবে তাদের কাছে জমা দিয়ে এসেছি।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘কুমিল্লা-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে হাসনাত আব্দুল্লাহ মনোনয়ন দাখিল করেছেন। সেখানে আমরা দেখেছি, বিএনপির প্রার্থী প্রায় শত কোটি টাকার ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করেছেন। যদিও তিনি এ বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় সেই তথ্য উল্লেখ করেননি। এটি স্পষ্টভাবে নিয়ম লঙ্ঘনের শামিল। তারপরও তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
‘অন্যদিকে, সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এতেশাম হকের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কিছু কাগজপত্র পরবর্তীতে দাখিল করবেন বলে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। অথচ একই জেলায়, সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থীর ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কাগজপত্র পরে দাখিলের শর্তে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ একই জেলার জেলা প্রশাসক একই পরিস্থিতিতে দুইজন প্রার্থীর ক্ষেত্রে দুই ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একজনের মনোনয়ন বাতিল করেছেন, আরেকজনেরটা বৈধ রেখেছেন। আমরা মনে করি, এটি একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি প্রশাসনের স্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের প্রমাণ।’
তিনি বলেন, ‘এ দুটি উদাহরণ আমাদের দলের হলেও এর বাইরে অন্তত আরও শতাধিক অনিয়মের উদাহরণ রয়েছে, যেগুলো আপনারা মিডিয়ার মাধ্যমে কাভার করেছেন। মানিকগঞ্জে আমরা দেখেছি, ন্যাক্কারজনকভাবে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সরকারি অফিসে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের মধ্যে গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি না, নাকি আগের তিনটি নির্বাচনের মতো প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব, রাতের ভোট ও পূর্বনির্ধারিত সেটেলমেন্টের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে ‘
তিনি আরও বলেন, ‘আমার নিজ জন্মস্থানেও বিএনপির প্রার্থী তার হলফনামায় প্রায় ১৯০ কোটি টাকার ঋণখেলাপির তথ্য উল্লেখ করেননি এবং একই সঙ্গে তিনি তুরস্কের নাগরিক–এ সংক্রান্ত তথ্য ও আইডি কার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব স্পষ্ট আচরণবিধি লঙ্ঘনের পরও তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘সামনে যেহেতু আপিল শুনানি হবে, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই-সেখানে যেন কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব, প্রেফারেন্স বা বড় দলের প্রতি দুর্বলতা না দেখানো হয়। যদি তা দেখা যায়, তাহলে এই নির্বাচন কমিশনের সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং জনগণের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীর হবে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে আগোচ্ছি, সেখানে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন, অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু জীবনযাপন করছেন। তাদের একটা আকাঙ্ক্ষা–নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা হবে, যেখানে জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।’
‘বিগত ১৭ বছর ধরে আমরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলাম। যদি আবারও প্রশাসন, সরকার বা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই সম্ভাবনাকে নষ্ট করার চেষ্টা করে এবং পুরোনো সেটেলমেন্টের মাধ্যমে জনগণকে প্রতারিত করা হয়, তাহলে আমরা চুপ করে বসে থাকব না। প্রয়োজনে আমরা আবার রাজপথে নামব এবং জনগণের ভোটাধিকার আদায় করে নেব।’
তিনি জানান, জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও তাদের দলের পক্ষ থেকে কনসার্ন রয়েছে। যারা ফ্যাসিবাদী শাসনের দোসর ছিলেন এবং বিগত সময়ে ভোটাধিকার হরণে ভূমিকা রেখেছেন, তারা যেন কোনোভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন–এই দাবি তারা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন।
এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যামামলার আসামি এবং একাধিক হত্যা মামলার আসামিদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার বিষয়েও তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।


