বিএনপির মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রবাসী বিএনপি কর্মীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সুনামগঞ্জ-৩ আসনের (শান্তিগঞ্জ ও জগন্নাথপুর) বিএনপি প্রার্থী ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
অনেকে আবার এ অভিযোগের সঙ্গে তারেক রহমানকে জড়িয়ে সামাজিকমাধ্যমে দাবি করছেন, বিএনপির তারেকের নাম ব্যবহার করে কয়ছর আহমেদ এ ধরনের মনোনয়ন বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন।
নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে এ ধরনের অভিযোগ ওঠায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরাও বিব্রতবোধ করছেন বলে জানা গেছে। যদিও দলের কেউ এখনো প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে সুনামগঞ্জ-৩ আসনের নির্বাচনী কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত।
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলের শীর্ষ নেতারা এই মুহূর্তে ব্যস্ত রয়েছেন। নির্বাচন শেষে অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিএনপি কর্মী আমিনুল ইসলাম মিঠু অভিযোগ করেছেন, রাজশাহী-৬ আসন (চারঘাট ও বাঘা) থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিশ্চিত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ তার কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে ৬৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী মোট তিন কোটি টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়ন পাননি। তবে কয়ছর আহমেদ ওই টাকা ফেরত দেননি।
এ নিয়ে গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি বিএনপির সব মনোনয়ন টাকার বিনিময়ে হয়েছে? এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা প্রতিবাদ আসেনি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করছেন বিএনপি-সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, তারাই কেবল এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতাদের বেশিরভাগই নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী আমিনুল ইসলাম মিঠুর বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চণ্ডিপুর বাজার এলাকায়। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস শহরের স্টারলাইন এলাকায় বসবাস করেন। নিউইয়র্কের স্টারলাইন, জ্যাকসন হাইটস, চায়না টাউন ও ম্যানহাটনে তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় তিনি এবার নিজ এলাকা থেকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং নিজেকে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ তাকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এ ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন রাজশাহী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তপু, যিনি মিঠুর পূর্বপরিচিত বলে জানা গেছে। এই তিনজনের কয়েকটি ফোনকলের রেকর্ডও সামাজিকমাধ্যমে ঘুরছে। টাইমস অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই ফোনকলের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিঠুর দাবি, চুক্তি অনুযায়ী টাকা লেনদেনের জন্য কয়ছর আহমেদ হোয়াটসঅ্যাপে দুটি ব্যাংক হিসাব নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠান। পাশাপাশি দলীয় মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত হয়েছে–এমন কিছু নথিও পাঠানো হয়, যেখানে মিঠুর মনোনয়ন নিশ্চিত দেখানো হয়েছিল। গত বছরের অক্টোবর মাসে কয়েক দফায় মোট ৬৫ লাখ টাকা কয়েকটি ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়।
টাকা পাওয়ার পর কয়ছর আহমেদ একাধিকবার মিঠুকে জানান, তারেক রহমান যেকোনো সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। তবে বাস্তবে তারেক কখনো মিঠুকে ফোন করেননি বা কোনো মাধ্যমেই যোগাযোগ করেননি বলে দাবি করেন মিঠু।
দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। কয়ছরের কথায় মিঠু তার বৃদ্ধ বাবাকে সেখানে পাঠালেও তাকে কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশের ব্যবস্থাও করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত মিঠু বিএনপির মনোনয়ন পাননি।
মনোনয়ন না পাওয়ার পর টাকা ফেরতের জন্য বারবার চাপ দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ ফেরত পাননি বলে অভিযোগ করেছেন আমিনুল ইসলাম মিঠু।


