ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নিয়েছে দিল্লি কর্তৃপক্ষ।
শনিবার ভারতীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক ডজন পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিতে বিক্ষোভস্থলে পৌঁছেছেন। তাদের কেউ পোশাকধারী, আবার কেউ সাদা পোশাকে ছিলেন।
ওয়াংচুককে নিয়ে যাওয়ার আগে তাকে বিক্ষুব্ধ ও গণমাধ্যম থেকে আড়াল করতে পুলিশ সদস্যদের বড় সাদা কাপড় ধরে থাকতে দেখা যায়।
বিক্ষোভের জন্য তৈরি মঞ্চে অবস্থান করলেও পুলিশি সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়নি।
দিল্লি পুলিশের উপকমিশনার শচীন শর্মা ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ, ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য তাকে একটি উপযুক্ত সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ওয়াংচুক বর্তমানে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।’
বার্তা সংস্থা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, হাসপাতালে ওয়াংচুক সচেতন ছিলেন এবং তার গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক সূচকগুলো স্থিতিশীল ছিল।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক গত ২৮ জুন থেকে অনশন করছেন। ভারতে সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি এ অনশন শুরু করেন।
সংগঠনটি গত মে মাসে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করছে। ওই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিক্ষুব্ধরা।
তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়া সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিরল ও প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শিক্ষাখাতের সংস্কার দাবিতে বছরের পর বছর তিনি একাই লড়ে গেছেন। এরইমধ্যে ওয়াংচুকের প্রতি দেশটির বিভন্ন অঞ্চলে ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তার দাবিসংক্রান্ত বক্তব্য ভাইরাল হয়ে ওঠায় এটি আন্দোলনকে আরও জোরালো করেছে। অনশনের তৃতীয় দিনে ওয়াংচুক রয়টার্সকে বলেছিলেন, তিনি মারা না গেলে এই অনশন ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে।
তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আশা করি, আমাদের এত দূর যেতে হবে না। গণতন্ত্রে একটি সংবেদনশীল সরকার মানুষের কষ্টের কথা শোনে। আমি আশা করি, তারা ব্যবস্থা নেবে।’
গত বৃহস্পতিবার দিল্লি উচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষকে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্যের ওপর নিবিড় নজর রাখতে এবং প্রয়োজন হলে হস্তক্ষেপ করতে বলে। তার শারীরিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় জোর করে খাবার খাওয়ানোর নির্দেশ চেয়ে করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ নির্দেশ দেয়।
বিক্ষোভস্থলে অবস্থান কর্মসূচি পালনকারী ককরোচ জনতা পার্টির কয়েকজন সমর্থককেও সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। তাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে নির্দেশনা অমান্য করায় এক নারী বিক্ষোভকারীকে পুলিশ সদস্যদের চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যেতেও দেখা যায়।

এদিকে সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিক্ষুব্ধরা।
ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ওয়াংচুক। পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা সোনম স্যারকে টেনে নিয়ে গেছে। প্রায় ৬০ বছর বয়সী একজন মানুষ ২০ দিন ধরে অনশন করছিলেন এবং কিছুই খাননি। দিল্লি পুলিশ তাকে জোর করে টেনে নিয়ে গেছে। তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই।’
সংগঠনটির বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে তারা আগামী ২০ জুলাই ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা করবেন। ওই দিন ভারতের পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ওয়াংচুকের সমর্থনে অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমি এখন থেকেই অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করছি।’
ভারতীয় সরকারের সঙ্গে ওয়াংচুকের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। গত বছর নরেন্দ্র মোদির সরকার ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষকে প্ররোচিত করার অভিযোগ তোলে।
ভারতের কেন্দ্রশাসিত হিমালয় অঞ্চল লাদাখে সহিংস বিক্ষোভের সময় তিনি সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওয়াংচুক ওই অঞ্চলেরই বাসিন্দা। এর জেরে প্রায় ছয় মাস কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের মার্চে তিনি মুক্তি পান।


