নির্বাচনে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ‘পোস্টাল ব্যালট’ বা ডাকযোগে ভোটদান পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে এই পদ্ধতিতে প্রবাসীদের ভালো সাড়া পাওয়া গেলেও এর বিশাল খরচ এবং ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা কমিশনকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিকল্প হিসেবে এখন প্রবাসীদের জন্য প্রতিনিধির মাধ্যমে ভোট বা ‘প্রক্সি ভোটিং’ ও ‘অনলাইন ভোটিং’ চালুর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইটি-নির্ভর পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় সাফল্য ছিল। তবে ভবিষ্যতে এই ধারা বজায় রাখা বেশ ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, দেশের ভেতরে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সাধারণ মানুষের জন্যও ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে কমিশন।
সাফল্য ও ব্যয়ের হিসাব
সংসদ নির্বাচনের আগে বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীদের নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ইসির তথ্য অনুযায়ী, মোট ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন ভোটার পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন, যার মধ্যে সাত লাখ ৬৩ হাজার ২৩৩ জনই ছিলেন প্রবাসী। শেষ পর্যন্ত ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৯৫ জন ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি ভোট বৈধ বলে গণ্য হয়।
তবে পোস্টাল ব্যালটে প্রবাসীদের ভোটদান ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রবাসীদের একটি ব্যালট পাঠাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা, যেখানে দেশের ভেতরে এই খরচ ছিল মাত্র ২২ টাকা। শুধুমাত্র ব্যালট বিলি করতেই খরচ হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা। প্রাথমিক হিসাব মতে, পোস্টাল ব্যালটের পেছনে মোট ব্যয় ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
গোপনীয়তা ও অপচয়
কর্মকর্তারা লক্ষ্য করেছেন, পোস্টাল ব্যালটের ডিক্লারেশন ফর্মে ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক থাকায় অনেকে গোপনীয়তা ফাঁসের ভয়ে ভোট দেননি। ব্যালট ছাপানো ও পাঠানোর পরেও অনেকে ভোট না দেওয়ায় প্রায় ২০ কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কমিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে যাতে তারা এর সমস্যা ও সুবিধাগুলো ঠিকভাবে চিহ্নিত করেন।
বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাচন কমিশনার জানান, খরচ কমাতে প্রবাসীদের জন্য ‘প্রক্সি ভোটিং’ একটি ভালো সমাধান হতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রক্সি ভোটিং নিয়ে আরও চিন্তা করার সুযোগ আছে। কারণ, এটি খরচ অনেক কমিয়ে দেবে। প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী বা প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার অনুমতি পেতে পারেন।’
এ ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে নিরাপদ অনলাইন ভোটিং চালুর বিষয়ও পরীক্ষা করছে ইসি। তবে এসব পদ্ধতি চালু করতে হলে নির্বাচনী আইন বা ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ২০২৫’-এ সংশোধন প্রয়োজন হবে।
ভোটের হার বাড়ানোর লক্ষ্য
ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে পোস্টাল ব্যালট বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন প্রকল্পের (ওসিভি-এসডিআই) টিম লিডার সেলিম আহমদ খান। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, গত নির্বাচনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোট পড়েছে। বাকি ৪০ শতাংশ ভোটারকেও ভোটের প্রক্রিয়ায় আনতে হবে এবং পোস্টাল ব্যালট এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রিকশাচালকের মত অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ তিন হাজার টাকা খরচ করে গ্রামে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। পোস্টাল ব্যালট তাদের সেই সুযোগ করে দেবে। এ ছাড়া প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী, সাংবাদিক ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রবাসীদের ভোটের খরচ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রবাসীরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠান, সেই তুলনায় জনপ্রতি ৭০০ টাকা খরচ খুব বেশি নয়। বর্তমানে ইসি বিভিন্ন দেশের পোস্টাল ভোটিং মডেল এবং অনলাইন অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।


