রাজধানী ঢাকার পরীবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ও ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার লাইনে অপেক্ষা করছিলেন মো. রফিক। আর আসাদগেটে তালুকদার ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন মো. আসিফ।
বুধবার রাজধানীতে জ্বালানির জন্য অপেক্ষায় থাকা দুজনের গল্প প্রায় একই রকম। একজন সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। বিকাল ৪টার সময় অর্থাৎ একজন ৮ ঘণ্টা, আরেকজন ৯ ঘণ্টা পরেও সেই লাইনেই দাঁড়িয়ে আছেন।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে এই সংকট। সরকার দাবি করছে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনায় এই সমস্যা। আর চাহিদা পূরণে প্রায়ই বিদেশ থেকে তেল আসার খবর আসছে। তবে বাস্তবতা হলো, সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোতে গাড়ির সারি দিনকে দিন বড় হচ্ছে।
দুই সপ্তাহ আগেও রাজধানীতে যেখানে তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পাওয়া যেত, সেটি এখন গিয়ে ঠেকেছে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টায়। আবার এই অপেক্ষার পরেও তেল মিলবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
মঙ্গলবার নববর্ষের ছুটির দিন বিকাল সাড়ে তিনটায় আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে ক্লান্ত-শ্রান্ত-অবসন্ন মোটর সাইকেল চালকদের দেখা গেল। তারা জানালেন, সকাল ৭টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তখন এই লাইন ছিল আরও লম্বা।
আরও কি ঘণ্টা দুয়েক লাগবে? এমন প্রশ্নে একজন বললেন, “তা হয়ত লাগবে না। তবে তেল পাব কিনা এ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কারণ, কিছুক্ষণ আগে মাইকিং শুনেছি, তেল নাকি শেষ হয়ে আসছে।”
ফুয়েল পাস কি স্বস্তি দিচ্ছে?
সংকট সমাধানে সরকারের নতুন উদ্যোগ ফুয়েল পাস পিপাসার্ত মানুষের কাছে এক ফোটা পানির মতোই।
পরীবাগে আটঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা শেষে রফিক পড়েন নতুন সমস্যায়। তিনি ফুয়েল পাসের সিস্টেম ঠিকমতো বুঝতে না পারছিলেন না। মোবাইল ফোনে পাস আছে দাবি করলেও সেটি খুঁজে বের করতে না পেরে মোবাইলটি দেন পাম্প অপারেটর মো. নাজমুলের হাতে। তিনিও কিউআর কোড বের করতে পারেননি। এই পাস থাকলে যেখানে ১০ লিটার তেল মিলত, সেখানে তাকে পাঁচ লিটার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে কিউআর কোড স্ক্যান করে এক হাজার টাকার তেল নেওয়ার ব্যবস্থা চালু আছে সাতটি পাম্পে।
তবে পাসধারী ও পাসবিহীনদের জন্য আলাদা লাইনের কোনো ব্যবস্থা নেই। পাস থাকার পরও যদি একই লাইনে দাঁড়াতে হয়, তাহলে বাস্তব সুবিধা কোথায়, সে প্রশ্ন করছেন ভুক্তভোগীরা।
অনেকেই আবার এই পদ্ধতি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছেন না। মেঘনা ফিলিং স্টেশনের কর্মী নাজমুল জানান, সকাল থেকেই তিনি অন্তত শতাধিক মানুষকে অ্যাপে নিবন্ধন করে দিয়েছেন। অনেকেই জানেন না যে তেল নিতে হলে আগে অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, “যারা বুঝতে পারেন না, তারা অনেক সময় বিরক্ত হন। আবার একজনের জন্য বেশি সময় লাগলে লাইনে থাকা অন্যরাও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।”
তবে ফুয়েল পাস থাকলেই যে তেল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। আসাদগেটের একটি পাম্পে এমন একজনের সঙ্গে কথা হয়, যিনি আগের দিন কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। পরদিন আবার ভোরে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন নতুন আশায়।
সাইফুল্লাহ নামের সেই ব্যক্তি বললেন, “আগে পাঁচশ টাকার বেশি তেল পাওয়া যেত না, এখন পাস থাকলে এক হাজার টাকার তেল নেওয়া যায়। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি তো কমছে না। যারা অ্যাপ ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য আলাদা লাইন থাকা উচিত।”
ফুয়েল পাস ব্যবহারকারীরা মাসে সর্বোচ্চ ৬০ লিটার তেল নিতে পারবেন। যারা বাইকে যাত্রী বহন করেন, তাদের জন্য এই সিলিং একটি সমস্যা বটে।
রাইড অ্যাপের বাইক চালক মো. রাশেদ বলেন, “৬০ লিটার তেলে আমাদের কাজ চালানো কঠিন হয়ে যাবে।” তার মতে, এই খাতের চালকদের জন্য আলাদা বিবেচনা বা বিশেষ ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন ছিল।


