ঢাকার রাজপথে এক যুবক ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে যুবক কখনও গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন কিংবা ডিআইটি ভবনের সামনে। সাদা স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে সে ঢাকার ‘পীচ ঢালা’ পথে হেঁটে বেড়াচ্ছে। তার পাশ দিয়ে দোতলা বাস, গরুর গাড়ি, রিকশা, বেবি ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার সবই যাচ্ছে। তার সে দিকে কোনো খেয়াল নেই। কণ্ঠে ‘পীচ ঢালা এ পথটাকে ভালোবেসিছি’। কিন্তু তার এ ভালোবাসার কারণ অন্য। কখন ভিড়ের মধ্যে, কখন একা হেঁটে যাওয়া মানুষের পকেট থেকে মানিব্যাগ নিয়ে সে চম্পট দিচ্ছে। এমন দৃশ্য ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম ক্লাসিক ‘পীচ ঢালা পথ’-এর।
বিখ্যাত এ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রে শাবানা, শাবনূরসহ অনেক বিখ্যাত নায়িকার আবিষ্কারক এতেহশাম। আর সিনেমার এ টাইটেল গানটিতে অভিনয় করা জলিল তখন টেলিভিশনের বিখ্যাত নায়ক। জীবনের চরম বাস্তবতায় সে আজ পকেটমার। তার বোন ববিতা। খুব সুন্দর গান গায়। রেডিওতে অডিশন দিয়ে টিকেও যায়। এরপর একের পর এক গানের অনুষ্ঠানে অংশ নেয় সে। বলা যায় রাতারাতি জনপ্রিয়তা পায়। তার প্রেমে পড়ে নায়ক রাজ রাজ্জাক। কিন্তু পৃথিবীর চিরায়িত নিয়মে তাদের প্রেমের পথে বাধা ধনী-গরিবের সামাজিক ব্যবধান। এ হলো সিনেমাটির মূল কাহিনি।
এ সিনেমাটি নিয়ে অনেকগুলো মজার তথ্য দিলেন চলচ্চিত্র গবেষক মীর শামসুল আলম বাবু। এর মহরত অনুষ্ঠিত হয়েছিল এফডিসিতে। ১৯৬৯ সালের ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত সে মহরতে ক্ল্যাপ স্টিক দিয়েছিল এক শিশু। যিনি পরবর্তীতে দেশের ইন্ডাস্ট্রির একজন বিখ্যাত নায়িকা হয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন ববিতারই ছোট বোন চম্পা। অভিনেতা জলিলের প্রেমিকার ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল বেবি রিতাকে। যিনি আমাদের দেশের আরেক বিখ্যাত নায়িকা সুচরিতার বড় বোন।
‘পীচ ঢালা পথ’ সিনেমাটির প্রযোজক ছিলেন জে.সি. আনন্দ ও মুস্তাফিজ। এর কাহিনিকার ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র সাংবাদিক আহমেদ জামান চৌধুরী। এর সুরকার ছিলেন প্রখ্যাত নায়িকা শবনমের স্বামী রবীন ঘোষ। এর চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনাতেও ছিলেন দুই জন বিখ্যাত মানুষ— হারুন-উর-রশীদ ও আমিনুল ইসলাম মিন্টু।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আহমদ জামান চৌধুরী এবং গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা এর গানে কণ্ঠ দিয়েছেন ওস্তাদ ফজলুল হক, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ বেগম, আব্দুল জব্বার, খুরশিদ আলম, লাভলি ইয়াসমিন ও মিলি জেসমিন। ৮টি গানের মধ্যে ‘পীচ ঢালা এই পথটারে’ ও ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’ গান দুটি এখনও মানুষের প্রিয় গানের তালিকায়।
সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭০ সালের ২৪ এপ্রিল। মুক্তির পর পরই ছবিটি দর্শকরা এর আগে রাজ্জাক, ববিতা, জলিলের অভিনয় দারুণ পছন্দ করে। অধিকাংশ গানই দর্শকদের মুখে মুখে ছিল। ফলাফল দারুণ নির্মাণের ছবিটি ব্যবসায়িকভাবেও সফল হয়।


