পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাহাড়ের দূরবর্তী এলাকার ভোটারদের এবং সমতলের আদিবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের দাবিও জানিয়েছে তারা।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকার সেগুনবাগিচার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি এ দাবি জানায়।
সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন পার্বত্য চট্টগ্রম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। আরও বক্তব্য রাখেন আদিবাসী অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমিলা, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্খা ও ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে অন্তর্ভুক্তিমুলক ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেটা এখনো অনিশ্চিত।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় আদিবাসীরা দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, অনুন্নত সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বসবাস করেন। সামরিক উপস্থিতি ও অনেক ক্ষেত্রে সেখানকার রাজনৈতিক কাঠামো স্থিতিশীল না হওয়ার দরুণ এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাবে তারা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নানা ক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে না। এমনকি জনগণনার সময়ও প্রান্তিক অঞ্চলে থাকা আদিবাসীরা বাদ পড়ে থাকেন কেবলমাত্র ভৌগোলিক দুর্গমতার মধ্যে বসবাস করবার কারণে। ঠিক তেমনি জাতীয় নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা থেকে অনেক আদিবাসী জনগণ বাদ পড়েন এই একই কারণে। ভোট কেন্দ্র থেকে বসবাসের স্থান দূরবর্তী হওয়ার কারণে তারা স্বত:প্রণোদিত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সক্ষম হন না।
তিনি যোগ করেন, ‘এমন ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাসকারী আদিবাসী জনগণের কথা বিবেচনায় রেখে নির্বাচন কমিশনের বেঁধে দেওয়া নিয়ম এসব এলাকার ক্ষেত্রে শিথিল করতে আমরা নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই।’
সংবাদ সম্মেলনে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে ও সমতলে আদিবাসীরা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সময় হয়রানির শিকার হন। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য মোতাবেক অতীতের থেকে যদি এই নির্বাচন ভালো হয়, তাহলে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ভোট দিতে আসা আদিবাসীদের জন্য যাবতীয় সকল সুবিধা দিতে হবে। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে আসন্ন নির্বাচন স্বার্থক করার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূ্র্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন করার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানাই। আদিবাসীদের সমস্যাটিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে।
লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘আমাদের নির্বাচন নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক দলকে নিবন্ধিত করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটা অবশ্যই রাখা উচিত ছিল। আমাদের দেশে আঞ্চলিক দলগুলোকে নির্বাচন করার জন্য সুযোগ দেওয়া হয় না। এই জায়গায় নির্বাচন নিবন্ধন আইনে পরিবর্তন হওয়া দরকার এবং এই ব্যাপারে পার্বত্য নেতাদের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগটা নেই। সেই সুযোগটা দেওয়া উচিত।’
পাহাড়ের সমস্যা আর সমতলের সমস্যা এক না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমতলের চোখ দিয়ে পাহাড়কে দেখলে হবে না। পাহাড়ের মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলসমূহকে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে স্পষ্টভাবে বার্তা দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল আদিবাসীদের অন্ধকারে ও পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব না। সকল আদিবাসীদেরকে দেশের মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। তাই তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ে নির্বাচিত আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা দরকার।’
মেইনথিন প্রমিলা বলেন, ‘আমরা বর্তমানে যে অসুস্থ পরিবেশে আছি, ভবিষ্যতে আদিবাসী নারী ও আদিবাসীদের অবস্থা কি হবে তা আমার জানা নেই। চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন ছাড়া আদিবাসী জাতিগুলোর কথা কেউ স্পষ্টভাবে বলছে না। আদিবাসীদের সমস্যার কথা শোনার জন্য কোনো রাজনৈতিক দলই আমাদেরকে ডাকেনি।’
মূল বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন কিছু দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো হলো,
ক. অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি:
আদিবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে আবাসনসহ খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করা। সমতল ও পাহাড়ে ভোটকেন্দ্রগামী সকল আদিবাসী ভোটারদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং অযথা হয়রানি বন্ধ করা।
খ. রাজনৈতিক দল ও আগামী সরকারের কাছে দাবি:
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করা। পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিকীকরণ ও স্থানীয় শাসন নিশ্চিতকরণে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক যথাযথ ক্ষমতায়ন করা। পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’কে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উদ্ভাত্ত ও ভারত থেকে প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা।
দেশের মূলস্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। ইউনিয়ন পরিষদসহ সকল স্তরের স্থানীয় সরকারে সমতলেরর আদিবাসীদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ ও আদিবাসী জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি কমিশন গঠন করা।


