পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) গেটে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ সোহাগ খুনের সময় পাথর নিক্ষেপকারী মো. রিজওয়ান উদ্দিন অভি আটকের পর প্রাথমিক স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে তিনি সোহাগের মাথা থেঁতলে দিতে পাথর দিয়ে আঘাত করেন বলে দাবি করেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) এস এম মো. নজরুল ইসলাম বুধবার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি না, এই হত্যাকান্ডের পেছনে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছিল। অভি কোন ক্ষোভ থেকে সেদিন পাথর মেরেছেন জিজ্ঞাসাবাদে তা জানিয়েছেন।’
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাতে পটুয়াখালী থেকে গ্রেপ্তারের পর অভি জিজ্ঞাসাবাদে সোহাগের প্রতি ক্ষোভের কারণ জানিয়েছেন। সোহাগের কারণে ধর্মান্তরিত অভি দেশ ছেড়ে মালয়েশিয়া পাড়ি জমিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। অভির স্ত্রী সুরভীকে নানাভাবে উত্যক্ত করতেন সোহাগ। সুরভীর মৃত্যুর খবরে দেশে ফিরে ‘আত্নহত্যার কারণ’ খুঁজে সোহাগের ওপর ক্ষিপ্ত হন অভি। হত্যাকাণ্ডের দিন অন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অভি পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে সোহাগের মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
বহুল আলোচিত মিটফোর্ড হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, আসামি রিজওয়ান উদ্দিন অভির বাবার নাম মনোরঞ্জন বসু ও মায়ের নাম বিউটি দেব মিলা। অভি জন্ম নেয়ার কয়েক বছর পর মারা যান তার বাবা। ২০০৭ সালে অভিকে বাবার বাড়ি রেখে বিউটি দেব মালয়েশিয়া চলে যান। সেখানে ওবায়দুর রহমান নামে এক মুসলিম ব্যক্তিকে বিয়ে করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ২০০৮ সালে অভিকে মালয়েশিয়া নিয়ে যান বিউটি। ওবায়দুর রহমানের কাছে বিভিন্ন বিষয় জানার পর ইসলাম ধর্মের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয় অভির।
এরই মধ্যে ফেসবুকে সুরভী নামে রাজবাড়ীর এক মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান অভি। ২০১৭ সালে দেশে ফিরে ধর্মান্তরিত হয়ে সুরভীকে বিয়ে করেন তিনি। এর পর আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে মিটফোর্ড ৩ নম্বর গেটে একটি খাবারের দোকান দেন অভি। ওই দোকান থেকে মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় করতেন। এরপর অভি স্ত্রীর পছন্দমতো কেরাণীগঞ্জে পাঁচতলা বাড়ি করেন। বাড়ি ভাড়া আর দোকানের আয় দিয়ে তাদের সংসার ভালো চলছিল।
অভি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, সোহাগ একদিন তার দোকানে গিয়ে প্রতিদিন ৩’শ টাকা করে চাঁদা দিতে বলেন। তিনি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সোহাগ ক্ষুব্ধ হয়ে অভির মোবাইল কেড়ে নেন। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করার পর মোবাইল ফিরিয়ে দেন সোহাগ। কিন্তু অভি ও তার স্ত্রীর অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ভিডিও রেখে দিয়ে সোহাগ ব্ল্যাকমেইল করতে থাকেন। কয়েক ধাপে অভির কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা নেন সোহাগ। ২০২৩ সালে অভি ফের মালয়েশিয়া চলে যান। অন্যদিকে গত বছরের মে মাসে স্ত্রী সুরভীর আত্মহত্যার খবরে তিনি দেশে ফিরে আসেন। স্ত্রীর মোবাইল ফোন যাচাই করে আত্মহত্যার পেছনে সোহাগের ভূমিকার বেশ কিছু আলামত পান।
অভির দাবি, মিটফোর্ডে যেদিন সোহাগকে হত্যা করা হয় সেদিন দুপুরের পর লম্বা মনির ফোনে অভিকে জানান- ‘আজ সোহাগকে ধরা হবে।’ পরে অভি ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখেন সোহাগকে মারপিট করা হচ্ছে। তখন তিনি আগের ক্ষোভ থেকে সোহাগের মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অভি এসব তথ্য দিলেও বুধবার আদালতে রিমান্ড শুনানি চলাকালে ভিন্ন কথা বলেন।
অভি আদালতে বলেন, ‘শুধু দূর থেকে একটি ছোট্ট পাথর নিক্ষেপ করেছি। আমি আঘাত করিনি।’


