আফগানিস্তানের সশস্ত্র তালেবান গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপারেশন গাজাব লিল-হক শুরু করেছে পাকিস্তান। বৃহস্পতিবার রাতে আফগান তালেবান পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবির পর সীমান্তজুড়ে নতুন করে সংঘর্ষে জড়ায় ইসলামাবাদ-কাবুল।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডনের খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আফগানিস্তানের তালেবানবাহিনী পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার চিত্রাল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররম ও বাজাউর সেক্টরে সীমান্তের একাধিক স্থানে গুলি চালায়।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে দুইজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পাক সেনাদের হামলায় অন্তত ১৩৩ জন আফগান তালেবান সদস্য নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ।
এরইমধ্যে পাকিস্তান বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে একটি গোলাবারুদের ডিপো ধ্বংস করেছে বলেও দাবি করেছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
সেইসঙ্গে টোরখাম সীমান্ত দিয়ে যেসব আফগান পরিবারকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা ছিল, তাদের খাইবারের ল্যান্ডি কোটাল এলাকায় একটি হোল্ডিং সেন্টারে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পাকিস্তান ও তালেবান কর্মকর্তারা শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রাতভর পাকিস্তান আফগানিস্তানের প্রধান শহরগুলোর ভেতরে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা ও সীমান্ত সংঘর্ষের পর এবার পাল্টাপাল্টি লড়াই আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্র জানায়, সীমান্তের একাধিক সেক্টরে তালেবান চৌকি, সদর দপ্তর ও গোলাবারুদের ডিপোর ওপর বিমান ও স্থল হামলা চালানো হয়। উভয় পক্ষই ভারী ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা দিয়েছে।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, কাবুল তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) জঙ্গি সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছে। তারা আফগানিস্তানের ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তানকে অশান্ত করে তোলার চেষ্টা করছে বলেও দাবি ইসলামাবাদের।
তবে আফগান তালেবান বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘পাকিস্তান সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় ৫৫ জন সেনা নিহত এবং ১৯টি চৌকি দখল করা হয়েছে। এছাড়া নানগারহারে আটজন তালেবান যোদ্ধা নিহত, ১১ জন আহত এবং ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন।’
জবাবে পাকবাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া অঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র মোশাররফ জায়েদি এক্স পোস্টে বলেন, ‘আফগানিস্তানে লক্ষ্যবস্তুতে পাকিস্তানের পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে।’ আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে ‘কোনো উসকানি ছাড়াই’ পাকিস্তানে হামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জায়েদি বলেন, ‘পাকিস্তানের পাল্টা হামলায় ১৩৩ জন আফগান তালেবান যোদ্ধা নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ২৭টি নিরাপত্তা চৌকি ধ্বংস ও নয়টি পাক সেনারা দখল করে নিয়েছে।’
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ বলেছেন, সীমান্ত পেরিয়ে আফগান হামলার পর দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় পাকিস্তানের ‘ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে’। এবার আফগানিস্তানের সঙ্গে ‘খোলামেলা যুদ্ধ’ চলছে বলেই মনে করছেন তিনি।
এক্সে পোস্টে তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর পাকিস্তান সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা করেছিল এবং তালেবান আফগান জনগণের কল্যাণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দেবে বলে প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তালেবান আফগানিস্তানকে “ভারতের উপনিবেশে” পরিণত করেছে। বিশ্বজুড়ে জঙ্গিদের একত্র করেছে এবং “সন্ত্রাস রপ্তানি” শুরু করেছে।’
‘আমাদের ধৈর্য এখন শেষ। এখন আমাদের মধ্যে খোলামেলা যুদ্ধ’, যোগ করেন তিনি।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক এই সহিংসতার উত্তেজনা কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিকে ক্রমেই নড়বড়ে করে তুলছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তার বক্তব্যে ওই যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো উল্লেখ করেননি।
কাবুলের এক প্রত্যক্ষদর্শী রয়টার্সকে জানান, রাতভর মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের পর বহু অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেছে।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের শেয়ার করা ভিডিওতে সীমান্তজুড়ে গোলাগুলির ঝলক ও ভারী আর্টিলারির শব্দ শোনা যায়। আরেকটি ভিডিওতে একটি ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। কর্মকর্তারা ওই ভবনকে পাকতিয়ায় তালেবান সদর দপ্তর হিসেবে উল্লেখ করেন।
সবশেষ এই সংঘর্ষের কয়েকদিন আগেই পাকিস্তান পূর্ব আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদের দাবি, ওই হামলায় টিটিপি ও ইসলামিক স্টেট জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়েছিল।


