পাকিস্তান ও তালেবান সরকারের সঙ্গে ১৯ থেকে ২২ মে চীনা উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উচ্চপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন অধ্যায়ের সূচিত হচ্ছে। প্রকাশ্য সংঘর্ষ নয়, বরং সূক্ষ্ম পুনর্গঠন ও কৌশলগত গভীরতা দ্বারা এটি চিহ্নিত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে কেরেন, এই কূটনৈতিক নৃত্যের কেন্দ্রে চীনের লক্ষ্য: ভারত সীমান্তের দুই অস্থির প্রতিবেশী— পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক ত্রিভুজ গঠন।
বৈঠকটি এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীব্র ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘর্ষের পটভূমিতে আয়োজিত হচ্ছে। বিষয়টি এরই মধ্যে নয়াদিল্লি-বেইজিং সম্পর্কে আরও ফাটল ধরিয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালীন ভারতের একটি বা একাধিক রাফাল যুদ্ধবিমান হারানোর খবর— যেখানে চীনা ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি পাকিস্তানকে সহায়তা করেছে বলে ধারণা— নয়াদিল্লিতে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে।
তবে বেইজিং জোর দিয়ে বলছে, এই ত্রিপক্ষীয় বৈঠক কোনোভাবেই ভারতবিরোধী নয়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বারবার বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গেই চীন নিরপেক্ষ অবস্থানে আছে এবং সংলাপ ও সংযমের পক্ষে।
কিন্তু কূটনৈতিক প্রতীক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বেইজিংয়ে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উষ্ণ অভ্যর্থনা। পাশাপাশি ইসলামাবাদের শীর্ষ কূটনীতিকের উপস্থিতিও নয়াদিল্লির উদ্বেগ হ্রাসে কোনো সহায়ক নয়।
এই সৌজন্যতার বাইরে রয়েছে আরও গভীর কৌশলগত পরিকল্পনা। তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান চীনের কাছে এখন এক ঘৃণিত রাষ্ট্র নয়, বরং এক উন্মোচিত সম্ভাবনার সীমান্ত। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ইতিমধ্যে পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত। আফগানিস্তান অর্থনৈতিকভাবে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এবং ভৌগোলিকভাবে এর প্রবেশদ্বারও—বিশেষ করে ওয়াখান করিডোর হয়ে। কঠিন পার্বত্য এলাকা সত্ত্বেও চীনা পরিকল্পনাকারীরা ইতিমধ্যে এমন সড়ক ও রেলপথ কল্পনা করছে যা শিনজিয়াং থেকে কাবুল হয়ে তেহরান পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
এর লাভ? পশ্চিম চীন নিরাপদ করা, অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা রপ্তানি করা এবং ভারতকে ঘিরে ফেলা— একটি গুলিও ছোড়া ছাড়াই।
অর্থনৈতিক লাভও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসেই চীন-আফগান বাণিজ্য প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে। কাবুল এখন চীনা বাজারে পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। চীন আমদানি করছে আফগান কার্পেট ও বাদাম, আর রপ্তানি করছে সিনথেটিক কাপড় ও ভারী যন্ত্রপাতি। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের উদ্দেশ্য নিছক ব্যবসা নয়— বরং কৌশলগত প্রভাব খাটানো এবং আনুগত্য নিশ্চিত করা বলেও ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
চীনের তালেবান সংযোগ কোনো আদর্শভিত্তিক সম্পর্ক নয়— এটি পরস্পরের প্রয়োজন মেটানোর ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। চীনই প্রথম রাষ্ট্র যারা কাবুলে রাষ্ট্রদূত পাঠিয়েছে এবং তালেবানের রাষ্ট্রদূতকে গ্রহণ করেছে— তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিয়েই। বার্তাটি পরিষ্কার: তালেবানরা যদি চীনের দুই প্রধান দাবি— চীনা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও উইঘুর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কোনো আশ্রয় না দেওয়া— পুরণ করতে পারে, তাহলে স্বীকৃতি শুধু সময়ের অপেক্ষা।

অন্যদিকে, ভারত নিজেকে ক্রমেই কোণঠাসা অবস্থায় দেখছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন, আর চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা— সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি কৌশলগতভাবে অতিমাত্রায় প্রসারিত।
এই মুহূর্তে পশ্চিমা শক্তি বিশেষ করে ওয়াশিংটন যখন আফগানিস্তান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং মস্কো ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, তখন বেইজিং ধীরে ধীরে এই শূন্যস্থান পূরণ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার কেন্দ্র এখন ওয়াশিংটনের দিকে নয়, বরং বেইজিংয়ের নেতৃত্বে একটি ইউরেশীয় অক্ষের দিকে সরে যাচ্ছে।
তারা বলেন: চীন-পাকিস্তান-আফগানিস্তান ত্রিপক্ষীয় সম্মেলন কেবল একটি বৈঠক নয়— এটি এক ভবিষ্যৎ কাঠামোর রূপরেখা। যে রূপরেখায় একটি চীন-কেন্দ্রিক দক্ষিণ এশিয়া যা বহুপাক্ষিকতার বদলে দ্বিপাক্ষিক নির্ভরতার জালে আবদ্ধ হবে। আর সেই খেলার পরিচালক বেইজিং। ওয়াশিংটন বা নয়াদিল্লি নয়।
প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘ খেলায় চীনের বাজি— সড়ক, রেলপথ, আর বিরল খনিজ। সেনাবাহিনী ও সামরিক জোট দিয়ে নয়, বরং তা অর্জন হবে এমন পথে যেখানে দক্ষিণ এশিয়াকে চীনের ছাঁচে ঢেলে ফেলা যাবে- নীরবে, কিন্তু অপরিবর্তনীয়ভাবে।


