বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার যোগান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় হুমকির মুখে দেশের ‘সাদা সোনা’ চিংড়ি খাত। গত ১৫ বছরে প্রায় ৩৮ শতাংশ চিংড়ি রপ্তানি কমেছে।
বৈশ্বিক বাজারে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা বাড়ার অনুপাতে দেশীয় উৎপাদন না বাড়ায় মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই রপ্তানিপণ্য। একই সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলো উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমাতে সক্ষম হওয়ায় বাংলাদেশের চিংড়ির চাহিদাও শঙ্কাজনক হারে কমছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে চিংড়ি রপ্তানি আয় ৪৭৭ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯৬ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে সাদা সোনার দিন ফেরাতে এখনই আশা হারাচ্ছেন না এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিগত পরিবর্তন এবং উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন ভেনামি চিংড়ির চাষ দ্রুত বাড়ানোর মাধ্যমে অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব। একই সঙ্গে এই খাতে রপ্তানি আয় আগামী ৫ বছরে ১০ গুনও বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘আধুনিক চাষাবাদ ও প্রণোদনার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।’
সহায়ক নীতির অভাব, অতিরিক্ত ঋণ, চাষের ব্যয় এবং দুর্বল উৎপাদন পরিকল্পনার কারণে খাতটি তীব্র সংকটে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ প্রধানত বাগদা, গলদা ও হরিণা চিংড়ি রপ্তানি করে, যার মধ্যে বাগদার রপ্তানি হয় সবচেয়ে বেশি। এই প্রজাতিগুলো সাধারণত ঘেরে চাষ করা হয়। আর কিছু সমুদ্র থেকে আহরণ করে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর রপ্তানি করা হয়।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানিতে এই বড় ধসের মূল কারণ ভেনামি চিংড়ি, যেটির চাহিদা বর্তমানে বিশ্ব বাজারে সবচেয়ে বেশি। ইদানীং চিংড়ি উৎপাদনের ৭৭ শতাংশ পূরণ করে ভেনামি চিংড়ির প্রজাতি। এতে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড এবং ইরানসহ বিভিন্ন দেশ বড় পরিসরে ভেনামি চিংড়ি চাষের মাধ্যমে তাদের রপ্তানি বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত চিংড়ির মূল আমদানিকারক দেশের মধ্যে আছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কোরিয়া, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্য এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ। এই সব বাজারেই বাগদা, গলদা ও হরিণা চিংড়ির চাহিদা ব্যাপক আকারে কমে গেছে।
প্যাসিফিক সি ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিএফএফইএ সহ সভাপতি দোদুল কুমার দত্ত জানান, ইউরোপ এখনো বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। যেখানে মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ চিংড়ি যায়। বাকি অংশ যায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং অন্য দেশে।
দেশে প্রায় ১১০টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০টি সচল রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর বাইরে ৯১টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র প্রায় ২৫টি নিয়মিতভাবে রপ্তানিতে যুক্ত।
দেশের প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে চিংড়ি এবং মৎস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
দোদুল কুমার দত্ত বলেন, ‘বাগদা চিংড়ির উৎপাদন প্রতি হেক্টরে মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি। অন্যদিকে ভেনামি চিংড়ির ক্ষেত্রে এটি ৪০ থেকে ৬০ টন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।’
উৎপাদনে এই ঘাটতির কারণে বিশ্ববাজারে ভেনামি জাতের চিংড়ির বাজার মূল্য আরও কম এবং প্রতিযোগীতা বেশি বলে জানান তিনি।
ফাহিম সি ফুড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হাসান পান্না জানান, বাংলাদেশে ২০২৩ সালে অনুমোদন দিলেও এর বাস্তবায়ন এখনো ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ভেনামি চিংড়ি চাষের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিবেশগত ঝুঁকি, রোগ সংক্রমণ এবং দেশীয় প্রজাতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভেনামি চিংড়ি তিন মাসের মধ্যে আহরণ করা যায়। এর উৎপাদন ব্যয় প্রতি কেজিতে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। কম খরচ, দ্রুত বৃদ্ধি এবং অধিক পরিমাণ চাষের কারণে এটি বাণিজ্যিকভাবে বেশ লাভজনক।’
এখন পর্যন্ত সীমিত পরিসরে আট থেকে ১০টি ফার্মে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন রয়েছে।
হাসান পান্না জানান, ভারত থেকে অবৈধ ভাবে প্রচুর পরিমানে চিংড়ি পোনা দেশে ঢুকছে যা ঘের মালিকরা চাষের কাজে ব্যবহার করছেন।
বিএফএফইএ সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘কাঁচামালের ঘাটতি, উৎপাদন হ্রাস এবং নীতিগত দুর্বলতা চিংড়ির রপ্তানি ধসকে আরও তীব্র করে তুলছে।’
তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশীয় রপ্তানিকারকদের ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। অন্যদিকে ভারত, ভিয়েতনাম, চীন ও থাইল্যান্ডের চাষিরা চার থেকে পাঁচ শতাংশ সুদে ঋণের পাশাপাশি ভর্তুকি, বিদ্যুৎ বিল ছাড় এবং অন্য প্রণোদনা পেয়ে থাকে।
ফলে চিংড়ি রপ্তানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক দেশীয় কারখানা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গুলো কেবল ১৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। বাকি ৮৫ শতাংশই অচল অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে রপ্তানি কমলেও ইপিবি’র তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চিংড়ি রপ্তানিতে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে।
পাশাপাশি চিংড়িতে জেলি ঢুকানো ও ওজনে কম দেওয়ার মতো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় এই খাতে ক্রেতাদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।
হাসান পান্না বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রায় দুই লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করে। অন্যদিকে ভারত কেবল ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় দশ গুণ বেশি চিংড়ি উৎপাদন করছে। আমরা এখনো মূলত প্রচলিত চাষ পদ্ধতির ওপরই নির্ভরশীল।’
সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে বিএফএফইএ নীতি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভেনামি চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণের জন্য প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
বিএফএফইএ সভাপতি বলেন, ‘যদি সরকার চিংড়ি চাষকে কৃষির মতো বিবেচনা করে, হ্যাচারি ও খাবার কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয় এবং যথাযথ প্রণোদনা দেয় করে, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের চিংড়ি রপ্তানি পাঁচ থেকে দশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।’


