মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের পরকীয়া সংক্রান্ত গোপন তথ্যকে হাতিয়ার বানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন। স্থানীয় সময় বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যদের কাছে এমনই স্বীকারোক্তি জানান খোদ বিল গেটস।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিল গেটস জানান, মূলত তার দাতব্য ফাউন্ডেশনের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ হতো। তবে সে সময় এপস্টিনের অপরাধের ব্যাপ্তি পুরোপুরি বুঝতে পারেননি বলে দাবি করেন তিনি।
কখনোই এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেননি দাবি করে এই ধনাঢ্য ব্যক্তি অভিযোগ করেন, এপস্টিন তার বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের তথ্য ভালো করেই জানতেন এবং সেই তথ্য ফাঁস করার হুমকি দিয়ে একাধিকবার তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছিলেন।
এপস্টিনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে নিজের লিখিত বক্তব্যে গেটস বলেন, ‘আমার এসব ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে এপস্টিনের কোনোভাবেই জড়িত হওয়ার কথা ছিল না, তার কোনো সম্পর্কও ছিল না, কিন্তু বিষয়গুলো আমার পরিবারের জন্য কষ্টদায়ক ছিল। এপস্টিন আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কসংক্রান্ত তথ্য এবং এর সঙ্গে যুক্ত নানা মিথ্যা ব্যবহার করে আমাকে আবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের এপস্টিন-সংক্রান্ত মামলার নথি ও পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে তদন্ত করছে মার্কিন কংগ্রেস। গেটসের সাক্ষ্য মূলত সেই দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধীর সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ নিয়ে। এপস্টিন দরিদ্র বা অস্থিতিশীল পারিবারিক সম্পর্কে থাকা নারী ও কিশোরীদের বিকৃত যৌনচার ও নির্যাতনের ফাঁদে ফেলেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

এর আগে কুখ্যাত ওই অপরাধীর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি ও সরকারি সংস্কারবিষয়ক কমিটির কাছে গেটস গোপনে সাক্ষ্য দেন গেটস। ওই কমিটি এপস্টিন, তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্ভাব্য ফেডারেল প্রশাসনিক ব্যর্থতা তদন্ত করছে।
মামলার নথিতে এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখাদের ফাঁস হওয়া তালিকায় বিল গেটসের পাশাপাশি বিশ্বের বহু ধনাঢ্য ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কোমার গত মার্চে গেটসকে চিঠি দিয়ে সরাসরি উপস্থিত হয়ে সাক্ষাৎকারভিত্তিক সাক্ষ্য দেওয়ার অনুরোধ জানান।
নিউইয়র্ক টাইমস গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, কংগ্রেসের ওই কমিটির সাবেক প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা জেক গ্রিনবার্গকে গেটস তার সাক্ষ্যের প্রস্তুতিতে সহায়তার জন্য নিয়োগ করেছিলেন। তবে কমিটির এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, গ্রিনবার্গ দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে কমিটির সঙ্গে আর কাজ করেননি।
এপস্টিন ২০০৮ সালে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে যৌনবৃত্তি-সংক্রান্ত একটি ফৌজদারি অপরাধে দোষ স্বীকার করেছিলেন এবং ১৩ মাস কারাভোগ করেন। পরে ২০১৯ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নির্যাতন, বিকৃত যৌনাচারের উদ্দেশ্যে শিশু ও কিশোরীদের পাচারের অভিযোগ আনেন।
তবে এপস্টিন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিচার শুরুর আগেই ওই বছর কারাগারেই তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়, যা সরকারি তদন্তে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে চলতি বছর বিচার বিভাগ প্রকাশিত নথিতে দেখা যায়, ২০০৮ সালে কারাভোগ শেষে এপস্টিনের সঙ্গে গেটস একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাদের আলোচনার বিষয় ছিল গেটসের দাতব্য কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
ওই নথিতে এমন কিছু ছবিও ছিল, যেখানে গেটসকে কয়েকজন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। ছবিগুলোতে নারীদের মুখ আড়াল করা হয়েছিল। গেটস আগে থেকেই বলে আসছেন, এপস্টিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল দাতব্য কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করাকে গেটস মারাত্মক ভুল হিসেবেই দেখেন।
গেটস ফাউন্ডেশনের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের সঙ্গে এক সভায় গেটস তার পরকীয়ার দায় স্বীকার করেছিলেন।
গেটস ও এপস্টিনের সম্পর্কের কারণে গেটস ফাউন্ডেশনও আলোচনায় আসে। ফাউন্ডেশনটি গত এপ্রিল মাসে জানায়, এপস্টিনের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া জানুয়ারিতে বিচার বিভাগ প্রকাশিত ইমেইলগুলোতে এপস্টিন এবং গেটস ফাউন্ডেশনের কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগের তথ্যও উঠে আসে।
প্রতিনিধি পরিষদের কমিটির তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পরিচালনা, সমঝোতামূলক চুক্তি, এপস্টিনের মৃত্যু, মানব পাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতা, নৈতিকতার প্রশ্ন এবং সরকারি নথি প্রকাশে বিলম্বসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিচার বিভাগের প্রকাশ করা কোটি কোটি পৃষ্ঠার নথিতে এপস্টিনের সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও ব্যবসাজগতের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পর্কের তথ্য উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রয়েছেন। ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগ ছিল বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি, যাকে ট্রাম্প গত এপ্রিল মাসে বরখাস্ত করেন, এপস্টিন-সংক্রান্ত বিষয় পরিচালনার জন্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। সমালোচকদের একাংশ অভিযোগ করেন, তিনি ট্রাম্পকে জনসমালোচনা থেকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন।
ট্রাম্প দীর্ঘ সময় এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের বিরোধিতা করেন। তবে কংগ্রেসে বিপুল সমর্থনে একটি আইন পাস হয়ে নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক হওয়ার অল্প সময় আগে তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেন।


