শেরপুর সীমান্তে চোরাচালানের বিশাল সাম্রাজ্য

শেরপুর সীমান্তে চোরাচালানের বিশাল সাম্রাজ্য
সীমান্তে চোরাচালানের পণ্য পারাপারের দৃশ্য। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

শেরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও অভিযানের মধ্যেই সক্রিয় শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ ও চুনোপুঁটি কারবারিরা ধরা পড়লেও, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের সুযোগ নিয়ে মূল গডফাদাররা এখনও রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্য সীমান্তঘেঁষা শেরপুর জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল দীর্ঘ দিন ধরে চোরাচালানকারীদের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ভারতের তুরা, ডালো ও আসাম সীমান্তঘেঁষা অন্তত ২০টিরও বেশি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত অবৈধ পণ্য বাংলাদেশে ঢুকছে। কুখ্যাত পয়েন্টগুলোর মধ্যে বিলপাড়, নকশি, রাংটিয়া, লোহার ব্রিজ, গোমড়া, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, তাওয়াকুচা, বালিজুড়ি, কর্ণজোড়া, রাবার বাগান, বারোমারি, খলচান্দা, নাকুগাঁও, পানিহাটা এবং শালবাগান অন্যতম।

চোরাকারবারিরা সাধারণত গভীর রাত ও ভোরের সময়কে পণ্য পারাপারের জন্য বেছে নেয়। পাহাড়ি ছড়া ও ঘন বনের কারণে এসব এলাকায় নজরদারি চালানো বেশ কঠিন।

‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে এই অন্ধকার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রকদের নাম বেরিয়ে এসেছে। সীমান্তে কসমেটিক্স চোরাচালানের প্রধান নেতৃত্বে রয়েছে নাজিমুদ্দিন, সামী, আতিক ও মামুন। অন্যদিকে মাদকসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে জুয়েল, রাসেল ও লিটন কোচ।

এদের প্রত্যেকের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। এই মূল হোতাদের অধীনে একাধিক ছোট ছোট গ্রুপ নির্দিষ্ট দায়িত্ব ভাগ করে কাজ করে।

পণ্য পাচারের কৌশল হিসেবে চোরাকারবারিরা প্রথমে ভারতের ডালো’র দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকার অস্থায়ী গুদামে পণ্য জমা করে। পরে সুযোগ বুঝে সেগুলো বস্তাবন্দি করে বাংলাদেশের সীমান্তে এনে জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে ইজিবাইক, মোটরসাইকেল কিংবা সাধারণ ব্যাগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ময়মনসিংহ সেক্টরে বিজিবির অভিযানে প্রায় ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ হয়েছে এবং আটক হয়েছে ১১৪ জন। তবে এই অভিযানে কেবল নিম্নস্তরের বাহকরাই ধরা পড়েছে, মূল চক্র আড়ালেই থেকে গেছে।

আরও পড়ুন

এদিকে চোরাচালান চক্রের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, হামলার ভয়ে স্থানীয় মানুষ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চান না। ঝিনাইগাতী উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক বলেন, ‘সন্ধ্যার পর এলাকায় অন্যরকম থমথমে পরিবেশ দেখা যায়। দরকার ছাড়া আমরা বাইরে যাই না। মাঝেমধ্যে মানুষের চলাফেরা আর মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা যায়। অনেক কিছু চোখে পড়লেও নিরাপত্তার কারণে কিছু বলা যায় না।’

একই উপজেলার আরেক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বহু বছর ধরেই এসব চলছে। মাঝে মাঝে অভিযান হলে কিছুদিন কমে, পরে আবার আগের মতো শুরু হয়। সাধারণত শ্রমিক পর্যায়ের লোকজন ধরা পড়ে, কিন্তু নেপথ্যের মূল বড় কারবারিরা ধরা পড়ে না।’

শ্রীবরদী উপজেলার খাড়ামোড়া এলাকার বাসিন্দারা জানান, তারা শান্তিতে থাকতে চান। কিন্তু চোরাচালানের সাথে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ের কারণে তারা অনেক কিছু দেখেও চুপ থাকেন। রাতে অচেনা লোক ও যানবাহনের শব্দ শুনলেই বোঝা যায় কিছু একটা হচ্ছে।

নালিতাবাড়ীর পানিহাটা এলাকার বাসিন্দারা এ সমস্যার সামাজিক কারণ তুলে ধরে বলেন, এখানে কাজের সুযোগ কম থাকায় বেকার তরুণরা দ্রুত আয়ের আশায় চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। তবে এই তরুণরা মূলত নির্দেশ পালনকারী মাত্র। আসল ব্যবসা যারা চালায় তারা সামনে আসে না, তাই তাদের ধরা কঠিন।

সীমান্ত ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমান্ত নজরদারির সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিচ্ছে এই চক্রগুলো। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।

শেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তপথে মাদক ও অবৈধ পণ্যের চোরাচালান দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সাথে আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা বাড়ানো হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’

সীমান্তের চ্যালেঞ্জ নিয়ে শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁঞা বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো পাহাড়ি ও বনাঞ্চল হওয়ায় কিছু স্থানে নজরদারি করা আমাদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। তারপরও জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও থানা পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণ মাদক ও চোরাচালানি পণ্য জব্দের পাশাপাশি জড়িতদের আটকও করা হয়েছে।’

ময়মনসিংহ ৩৯ বিজিবি সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান সীমান্ত সুরক্ষায় তাদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চোরাচালান, মাদক পাচার, জাল নোট, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।’

তিনি এ অপরাধ নির্মূল করতে স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad