নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দ্রুত শুনানির অংশ হিসেবে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলা এবং ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলা হাইকোর্টের বিশেষায়িত বেঞ্চের তালিকাভুক্ত হয়েছে। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কেএম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের রোববারের কার্যতালিকায় মামলা দুটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
গত ১ জুন টাইমস অব বাংলাদেশে ‘Swift Verdicts Snag in HC Logjam’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, আলোচিত অনেক মামলায় নিম্ন আদালত দ্রুত রায় দিলেও সেসব রায়ের কার্যকর বাস্তবায়ন প্রায়ই উচ্চ আদালতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আটকে যায়। প্রতিবেদনে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স এবং আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ওই প্রতিবেদনে আইন বিশেষজ্ঞরা শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের মামলাগুলো দ্রুত শুনানির জন্য পৃথক বা বিশেষ বেঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। এরপর ১০ জুন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী শিশু মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য এই বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি।
প্রসঙ্গত, মাগুরা সদরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গেলে গত বছরের ৫ মার্চ রাতে বোনের শ্বশুর হিটু শেখ আট বছরের আছিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় ৮ মার্চ ভুক্তভোগীর মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের নামে মামলা করেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আছিয়ার মৃত্যু হয়।
এরপর ওই বছরের ১৩ এপ্রিল আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। মামলা দায়ের হওয়ার দুই মাস ১০ দিন পর ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রায়ে হিটুকে এক লাখ টাকা জরিমানাসহ মৃত্যুদণ্ড ও বাকি তিন আসামিকে খালাস দেয়। ২১ মে মামলার যাবতীয় নথি ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে আসে।
ফৌজদারি কোনো মামলায় নিম্ন আদালতে আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে, সেটি কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসেবে পরিচিত। এ অনুসারে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দণ্ডিত আসামি রায়ের বিরুদ্ধে জেল আপিল ও আপিল করতে পারেন। এ ছাড়া আসামির বিবিধ আবেদনও করার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের জেল আপিল, আপিল ও বিবিধ আবেদনের ওপর একসঙ্গে শুনানি হয়ে থাকে। তবে শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক প্রস্তুত করতে হয়। এতে মামলার এজাহার, অভিযোগ গঠন, সাক্ষীদের বক্তব্য, বিচারিক আদালতের রায়সহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকে।
মাগুরার আলোচিত ওই মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৫ জুন হাইকোর্টে আপিল করেন হিটু শেখ। এই আপিলের গ্রহণযোগ্যতার ওপর শুনানি নিয়ে গত বছরের ১ জুলাই হাইকোর্টে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের রায়ে তাকে দেওয়া অর্থদণ্ড স্থগিত করা হয়।
এদিকে ফেনীর সোনাগাজীতে ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রত্যাহার না করায় ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ ঘটনায় করা মামলায় অধ্যক্ষসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
এর আগে নুসরাতের নিহতের ঘটনায় তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা করেন। এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করে আদালত। ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য দিন ধার্য হয়। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার সব নথি হাইকোর্টে পৌঁছে।


