কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ঝুঁকি মোকাবিলার উপায় নিয়ে বিশ্বনেতাদের আলোচনার মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, সরকারি যোগাযোগে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ (এসআই) ব্যবহার করবে তার প্রশাসন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এ কথা জানান। এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো এআই-সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা এবং প্রযুক্তিসংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করার পর এ শিল্পের ওপর সরকারি নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
অধিবেশনটিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আর্টিফিশিয়াল’ বা কৃত্রিম শব্দটি এই প্রযুক্তির সক্ষমতাকে খাটো করে উপস্থাপন করে। তাই ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নামটি ‘অনেক ভালো শোনায়’ ও ‘অনেক বেশি যথার্থ’ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশও এই নতুন নামটি নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিক উদ্যোগের মধ্যে এটি সর্বশেষ। গত বছর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করা হয়। এরপর গত আগস্টে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারীদের সতর্কবার্তার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দেওয়া সতর্কবার্তারও তুলনা করেন। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ঐকমত্যে স্বীকৃত।
ট্রাম্প বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে কোনো বৈশ্বিকতাবাদী কাঠামো তৈরির যেকোনো প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি বড় নতুন প্রযুক্তিই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে, আর সুপার ইন্টেলিজেন্সও এর ব্যতিক্রম নয়।’
তিনি যুক্ত করেন, ‘যারা বলেছিলেন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আমরা ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাব, তারাই এখন বলছেন এআই আমাদের সবাইকে হত্যা করবে, রোবোট আমাদের ওপর হামলা করবে এবং সবকিছু সম্পূর্ণ বিপর্যয়ে পরিণত হবে।’
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের সমন্বয়ে ২০টিরও বেশি দেশের নেতারা উন্নত এআইয়ের জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তিটির বিকাশ একে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এআই প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানীয় দুই শক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগে সমর্থন দেয়নি।
একই বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, ২০২৭ সালে ব্রিটেন জি-২০-এর সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বৈশ্বিক এআই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে সাইবার হামলা শনাক্ত করতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে এআই প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে আমাদের প্রস্তুতি বাড়াতে এবং এআইয়ের নিরাপদ বিকাশ নিশ্চিত করতে আমরা একক বৈশ্বিক নীতি ও মানদণ্ডে সম্মত হওয়ার জন্য কাজ করব।’
এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, আগামী বছর জি-২০-এর আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রিটেনের ভূমিকা কাজে লাগিয়ে এআই নিয়ে ‘একক বৈশ্বিক নীতি ও মানদণ্ড’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে লন্ডন।
এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাবমুক্ত এআই প্রযুক্তি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। সাধারণ পরিষদে মাখোঁ বলেন, ‘আমি চাই না কেউ বৃহৎ শক্তিগুলোর কোনো একটির খাস প্রজা হয়ে উঠুক।’ তিনি সম্ভবত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে এ কথা বলেন।
মাখোঁ আরও বলেন, ‘আমাদের বিনিয়োগ সক্ষমতাগুলোকে একত্র করে অত্যাধুনিক একটি ওপেন সোর্স এআই মডেল তৈরি করতে হবে, যা আমরা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেব। আমাদের অন্য কারও ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এআই কোম্পানিগুলোও এআই নিরাপত্তা নিয়ে বৈশ্বিক সমন্বয়ের আহ্বান ক্রমেই জোরদার করছে। ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান বুধবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দেবেন।
মঙ্গলবার ফরাসি এক কর্মকর্তা জানান, অ্যানথ্রপিকের প্রধান দারিও আমোদেই এবং হাগিং ফেসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্লেমঁ দেলাংওয়েও অনলাইনে যুক্ত হয়ে বৈঠকে অংশ নেবেন। চলতি মাসে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে থাকা ফ্রান্স এই বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটি মনে করে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এআইয়ের হুমকি জাতিসংঘে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়নি।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই আলোচনাকে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যোগাযোগের সঙ্গে তুলনা করেন।
সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে গুতেরেস বলেন, ‘যেসব সরকারের এআই সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, মানবতার প্রতি তাদের দায়িত্বও সবচেয়ে বেশি। তাই তাদের সংলাপের পথ তৈরি করতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো অভিন্ন অস্তিত্বগত ঝুঁকি মোকাবিলায় তা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল।’
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের আগে এআই নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে একটি যোগাযোগ চ্যানেল তৈরির বিষয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলোচনা করছে।


