ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। দেশটিতে ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) চলমান আন্দোলনের মুখে শনিবার দুপুরে পদত্যাগ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নিজেই পদত্যাগের তথ্য জানান।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এরইমধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
শনিবার বিকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকার পক্ষের তৃতীয় দফার বৈঠকের নির্ধারিত সময়ের আগেই পদত্যাগ করলেন তিনি।
— Dharmendra Pradhan (@dpradhanbjp) July 25, 2026
একমাসের বেশি সময় ধরে দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। কেন্দ্র সরকার শিক্ষার্থীদের সেই দাবি মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির সবচেয়ে বড় জেন-জি আন্দোলন সফলতার মুখ দেখল।
এর আগে শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া সরকারের সঙ্গে আর কোনো আলোচনা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেয় ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিরা। শুক্রবার বিকালে কেন্দ্র সরকারের দুই মন্ত্রী জগৎ প্রকাশ নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকে তিন দফা দাবি জানান তারা।
দাবিগুলো হলো- শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা এবং জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যায় মারা যাওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
শুক্রবারের বৈঠকে আন্দোলনকারীদের দুটি প্রধান দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। এগুলো হলো- আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সেদিন কোনো সমঝোতা হয়নি।

শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মুখে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঠেকাতে গত দুই দিনে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলোর বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন সংশোধনের পরিকল্পনাও করছে সরকার। সংশোধনের মাধ্যমে আরও কঠোর শাস্তি ও জরিমানার বিধান যুক্ত করা হবে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষা সচিবকে সরিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা আয়োজক সংস্থা- জাতীয় পরীক্ষা কর্তৃপক্ষের ৪৭ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং শিগগিরই সংস্থাটির সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে ভারতে জেন-জি আন্দোলনের পটভূমি রচিত হয়
গত মে মাসে ভারতের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষা (নিট) এবং সরকারি চাকরির কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠে কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে।
এর পরপরই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি মামলার শুনানির সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করেন।
তার এই মন্তব্য ঘিরে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অনলাইনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের বহু তরুণ প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্যকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তেলাপোকাকে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে বেছে নেন।
এর জেরে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে। কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
সামাজিকমাধ্যমে ‘উই আর ককরোচেস’ নামে হ্যাশট্যাগ দিয়ে আন্দোলনকারীরা নিজেদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করছেন।

সংগঠনের সমর্থকেরা বেকারত্ব, সীমিত চাকরির সুযোগ এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে মোদি সরকারকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গচিত্র, রসাত্মক নির্বাচনী স্লোগান ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রকাশ করতে থাকেন। অনুসারীদের পাশে অবস্থান করতে গত জুন মাসে অভিজিৎ দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে আসেন। এরপর তার নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনটি রাজপথে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
মূলত শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন নতুন করে প্রাণ পায় ভারতের লাদাখের বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থন পাওয়ার পর। তিনি সিজেপি এবং বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকাল অনশন শুরু করলে সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কেন্দ্র সরকারের আশ্বাসের পর ২৬ দিনের অনশন ভাঙেন সোনম ওয়াংচুক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এক ভিডিও বার্তায় শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তার জেরেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত এলো।


