গ্রিনল্যান্ডের দখল নেওয়ার প্রচেষ্টাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এ কারণেই ইউরোপের দেশগুলোরর সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছেন তিনি।
এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা না দিলেও ট্রাম্প জানান, আর্কটিক অঞ্চলটির সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর আরও উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হবে।
রোববার নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরেকে পাঠানো এক বার্তায় ট্রাম্প লেখেন, বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ বন্ধে ভূমিকা রাখার পরও নরওয়ে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দেওয়ায়, তিনি আর কেবল ‘শান্তির কথা’ ভাবতে বাধ্য নন। তার ভাষায়, ‘শান্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাও আমার কাছে সমানভাবে জরুরি।’
তার এমন মন্তব্যের কিছু সময় আগেই ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী স্টোরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্পকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পের বদলে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে বেছে নেওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে অসন্তোষ জানান ট্রাম্প। সে সময় তিনি দাবি করেন, রাশিয়া বা চীনের মতো পরাশক্তির হাত থেকে ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষা করতে পারবে না।
এদিকে গত শনিবার ট্রাম্প ঘোষণা দেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের ওপর ধাপে ধাপে শুল্ক আরোপ করা হবে। তালিকায় রয়েছে ডেনমার্ক, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড। এর বাইরে যুক্তরাজ্য ও নরওয়েও এই শুল্কের আওতায় পড়বে। ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কেনার অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে।

ট্রাম্পের এমন প্রকাশ্য হুমকি এরইমধ্যে ভাবিয়ে তুলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে। সেইসঙ্গে সামরিক জোট ন্যাটোর ওপরও চাপ বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ড মূলত ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। কাজেই গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্বে আঘাতকে গোটা ইউরোপের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে প্রতিরক্ষা সাহায্য দেওয়া নিয়ে গত বছর থেকেই ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের টানাপড়েন চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের পূর্ণ দখল চাওয়া এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুঁশিয়ারি ন্যাটো জোটের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
তবে এ বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান অনড়। তিনি বেশ আগে থেকেই বলে আসছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষায় যথেষ্ট ব্যয় না করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে না।
ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকিতে ইউরোপের শিল্পখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ইউরোপের শেয়ার বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৫ সালের মতো ফের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
সম্প্রতি লন্ডন সফরে গিয়ে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে মানুষের সঙ্গে বাণিজ্য করা যায়। কিন্তু মানুষ বা ভূখণ্ড কেনাবেচা করা যায় না।’
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেন, ‘দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার কেবল এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের হাতে। বহির্বিশ্বের কোনো ধরনের চাপ মেনে নেওয়া হবে না এবং গ্রিনল্যান্ড সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান ও আন্তর্জাতিক আইনের পথেই অটল থাকবে।’
এরই মধ্যে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে ডেনমার্ক। ডেনিশ সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ‘আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’ মহড়ার অংশ হিসেবে সেনারা সোমবার পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের কানগারলুসুয়াকে পৌঁছেছে।
ট্রাম্পকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানাতে বাড়ানো হচ্ছে কূটনৈতিক চাপ। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎজ বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান এবং কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ কাম্য নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি অযৌক্তিক শুল্ক আরোপ করে, তাহলে জার্মানি ও ইউরোপ তার জবাব দিতে প্রস্তুত থাকবে।


