মেক্সিকো সিটির কেন্দ্রস্থলের একটি ব্যস্ত ও শ্রমজীবী মহল্লা। চারপাশের হকারদের ভিড় আর গোলকধাঁধার মতো গলির মাঝে প্লাস্টিকের টেবিলের ওপর কোনোমতে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি টেলিভিশন। মেক্সিকো জাতীয় দল বিশ্বকাপে আরও একটি ম্যাচে জয় পেতে সেই টিভির সামনে জড়ো হওয়া মানুষের কণ্ঠ চিরে এক বজ্রকঠিন গর্জন ছড়িয়ে পড়ল পুরো এলাকায়। এই গর্জন প্রতিধ্বনি হলো লাতিন আমেরিকার এই দেশটির আনাচে কানাচে থাকা লাখো সমর্থকের মধ্যে–যারা প্লাজা, হাইওয়ের ওভারপাসের নিচে কিংবা ট্যাকো বিক্রির ছোট দোকানের স্ক্রিনে চোখ রেখে উল্লাসে মেতে উঠেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে নিজেদের দেশ এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেও স্টেডিয়ামের টিকিটের আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ মেক্সিকানদের পক্ষে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আর তাই মেক্সিকোর সাধারণ মানুষ এই আসরকে নিজেদের মতো করে আপন করে নিতে বেছে নিয়েছেন রাজপথকে, রাস্তায় রাস্তায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব উদযাপনের মঞ্চ।
ডজনখানেক প্রতিবেশীর সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে টিভি দেখছিলেন এসমোরাল্ডা সেরাটো। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু আমি এই রাস্তায় থাকাই বেশি পছন্দ করছি। আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি নিজের বসার ঘরে বসেই খেলা দেখছি। আমি আমার শিরায় শিরায় রক্তের স্পন্দন অনুভব করছি যা বলছে, এটাই হলো বিশ্বকাপ।’
টিকিটের দামে মাঠ থেকে ছিটকে পড়ছেন সাধারণ সমর্থকেরা
টানা দুটি ম্যাচে মেক্সিকোর জয়ের পর আয়োজক শহর মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মনতেরিতে লাখো মানুষের এই গণ উদযাপনের সমান্তরালে গত কয়েক মাস ধরে এক তীব্র সমালোচনাও চলছে। বিশ্বকাপের টিকিটের চড়া দামের জন্য বিশ্বজুড়ে ফিফাকে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়তে হচ্ছে। মেক্সিকোর মতো একটি দেশে, যেখানে একজন শ্রমিকের গড় মাসিক আয় প্রায় ৪৩৩ ডলার এবং যেখানে ফুটবলকে শ্রেণিভেদ ভুলে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার অন্যতম মাধ্যম মনে করা হয়, সেখানে কারা মাঠে ঢুকতে পারছেন আর কারা পারছেন না, সেই বৈষম্যটি খুব গভীরভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
অক্সফাম মেক্সিকোর রাজস্ব ন্যায়বিচারবিষয়ক সমন্বয়ক ডিয়েগো মের্লা বলেন, এই পরিস্থিতি সামাজিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং অনেক মেক্সিকানের মনে হচ্ছে, এটি এমন এক উৎসব যেখানে তাদের কোনো আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। মের্লা আরও বলেন, ‘বিশ্বকাপের পুরো আয়োজনটি সাজানো হয়েছে এখান থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা বা মূল্য নিংড়ে নেওয়ার বাণিজ্যিক যুক্তিতে। যারা সর্বোচ্চ অর্থ দিতে ইচ্ছুক এবং সক্ষম, মূলত তাদের পকেট কাটার জন্যই এই ব্যবস্থা। আর এটি শেষ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষকে মাঠ থেকে ছিটকে দিয়েছে।’
চলতি বছরের শুরুতে যখন টিকিট বিক্রি শুরু হয়, তখন এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪০ ডলার থেকে ৮ হাজার ৬৮০ ডলার পর্যন্ত। কিন্তু পরবর্তীতে এই দাম লাফিয়ে লাফিয়ে আকাশ ছুঁয়েছে, এমনকি বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের কিছু টিকিটের দাম বর্তমানে প্রায় ৩২ হাজার ৯৭০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
এই ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য টিকিটের চড়া দামের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইনফান্তিনো বলেন, ‘আপনি যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কলেজের খেলা দেখতে গেলেও ৩০০ ডলারের কম খরচে টিকিট পাবেন না, সেখানে শীর্ষ পেশাদার বা আন্তর্জাতিক স্তরের খেলা তো দূরের কথা। আর এটি তো খোদ বিশ্বকাপ!’
সাধারণ মানুষের ঘরোয়া উদযাপন ও তেপিতোর গল্প
গুইলার্মো রামিরেজের মতো একনিষ্ঠ সমর্থকদের কাছে এর সমাধান ছিল পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। ৪৯ বছর বয়সী রামিরেজ মেক্সিকো সিটির শ্রমজীবী মানুষের এলাকা তেপিতোর বাসিন্দা। এই এলাকাটি মূলত নকল বিশ্বকাপের জার্সি বিক্রির বিশাল সব ফুটপাথ মার্কেটের জন্য পরিচিত। এখানে অপরাধের তকমা লেগে থাকা এই মহল্লাটিতে ফুটবল হলো মূলত এক ধরণের প্রতিরোধ এবং স্থানীয় আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই ঘিঞ্জি বাজারের ঠিক কেন্দ্রস্থলেই রয়েছে একটি ফুটবল মাঠ, যার নামকরণ করা হয়েছে এই এলাকাতেই জন্ম নেওয়া মেক্সিকোর বিখ্যাত ফুটবলার বার্নার্ডো মানোলেতে হার্নান্দেজের নামে।
সেই মাঠ থেকে মাত্র এক ব্লক দূরে, মেক্সিকোর উজ্জ্বল সবুজ ও সাদা রঙের জার্সি গায়ে জড়িয়ে রামিরেজ দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তার বাড়ির সামনে ও ছোট মোড়ের দোকানের পাশে দুটি প্লাস্টিকের টেবিলের ওপর একটি টিভি স্ক্রিন এবং স্পিকার বসিয়েছেন। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো যখন বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল, তখনো ছোটবেলায় তিনি স্টেডিয়ামে যেতে না পারা প্রতিবেশীদের বসানো টিভিতেই খেলা দেখেছিলেন।
রামিরেজ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা স্রেফ স্টেডিয়ামে যাওয়ার খরচ জোগাতে পারেন না। তেপিতো হলো ফুটবলের একটি আড্ডাখানা, আর যখন কোনো ম্যাচ থাকে, সবাই নিজ নিজ টিভি বাইরে বের করে নিয়ে আসে খেলা দেখতে, বিশেষ করে এখন তো বিশ্বকাপ চলছে।’
সবুজ ও লাল রঙের লুচা লিব্রে অর্থাৎ মেক্সিকান কুস্তির মাস্ক পরে, কোলে বাচ্চা নিয়ে প্রতিবেশীদের এক বিশাল দল তার স্ক্রিনের সামনে ভিড় জমায় এবং রামিরেজের দোকান থেকে কেনা বিয়ারের বোতলে চুমুক দেয়। যখনই মেক্সিকো দল জয়লাভ করে, রামিরেজের প্রতিবেশীসহ মেক্সিকো সিটির বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ রাস্তায় ঢল নামায়। হাজার হাজার মানুষ মেক্সিকো সিটির কেন্দ্রীয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘অ্যাঞ্জেল দে লা ইনডিপেনডেন্সিয়া’র দিকে ছুটে যায়।
বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন ও প্রেসিডেন্টের আহ্বান
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাউমও টিকিটের এই অতিরিক্ত খরচের সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, ফিফা নেতাদের উচিত তাদের এই চড়া মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে পুনরায় ভাবা। শিনবাউম বলেন, ‘ফুটবলকে কেবল বাণিজ্যের চেয়ে বেশি কিছু হতে হবে।’
শিনবাউম সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার ও ফিফার যৌথ উদ্যোগে মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মনতেরিতে বিনামূল্যে আয়োজিত পাবলিক ওয়াচ পার্টিগুলোতে অর্থাৎ বড় পর্দায় খেলা দেখার স্থানগুলোতে যোগ দিতে। মেক্সিকোর রাজধানীতেই এমন প্রায় ২০টি ভেন্যু তৈরি করা হয়েছে, যার বেশ কয়েকটি নিম্ন আয়ের এলাকাগুলোতে অবস্থিত।
একটি ম্যাচের সময় মেক্সিকো সিটির মূল চত্বর ‘জোকালো’তে ২ লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন, যেখানে মেক্সিকোর জার্সির এক বিশাল সমুদ্রের মাঝে উন্মাতাল ঢেউয়ের মতো মেতে উঠেছিল সাধারণ মানুষ।
আরমান্দো সোরিয়ানো তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে শহরের প্রান্তসীমা থেকে রামিরেজের বাড়ির মাত্র এক মাইল দূরের একটি ছোট ফ্যান ফেস্টে খেলা দেখতে এসেছিলেন। সেখানে স্থানীয়রা মোটরসাইকেল নিয়ে স্ক্রিনের সামনে হাজির হচ্ছিলেন এবং ভ্রাম্যমাণ গাড়ি থেকে প্লাস্টিকের টবে করে বিয়ার, টেকিল ও স্ন্যাক্স বিক্রি করা হচ্ছিল।
সোরিয়ানোর মতে, ফিফার মূল জাঁকজমকপূর্ণ ইভেন্টের চেয়ে এই পরিবেশটিকেই অনেক বেশি মেক্সিকান বলে মনে হচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমার পরিবার এই উন্মাদনার সঙ্গে মিশে যাক–সবকিছুর চেয়ে বড় কথা, মেক্সিকান হওয়ার আসল অর্থ কী এবং এখানকার মানুষ যে ঐতিহ্য লালন করে ও শ্বাস নেয়, তা তারা কাছ থেকে অনুভব করুক।’


