চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাসের হার নেমেছে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এক বিষয়ে ফেল করে অকৃতকার্য হয়েছে ২৮ হাজার ৭৭১ শিক্ষার্থী। শূন্য পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে হয়েছে আটটি। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা মানবিক বিভাগে। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ফল বিপর্যয়ের পেছনে উঠে এসেছে একাধিক কারণ- গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বলতা, দক্ষ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত মোবাইলনির্ভরতা, শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের ধাক্কা এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে তুলনামূলক কঠোরতা।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এ বছর ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে ৫২ হাজার ৭৫৬ জন। অথচ ২০২২ সালে বোর্ডের পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। পাঁচ বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট।
এক বিষয়ে ফেলেই সর্বনাশ
ফলাফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এক বিষয়ে অকৃতকার্যতার হার। এ বছর ২৮ হাজার ৭৭১ জন শিক্ষার্থী মাত্র একটি বিষয়ে ফেল করেছে। মোট পরীক্ষার্থীর হিসাবে এ হার ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ। আর মোট ফেল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৫৩ শতাংশই এক বিষয়ে অকৃতকার্য।
২০২২ সালে এক বিষয়ে ফেল করার হার ছিল ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এ হার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। শিক্ষকদের মতে, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের ভিত্তিগত দুর্বলতা এর অন্যতম কারণ।
হাজেরা তজু স্কুলের শিক্ষক আশরাফ উদ্দিন বলেন, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ঐতিহ্যগতভাবে গণিত ও ইংরেজিতে কিছুটা দুর্বল। এবার সেই দুর্বলতা আরও প্রকট হয়েছে। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং পড়াশোনার বাইরে বেশি সময় কাটানোর প্রবণতাও এর জন্য দায়ী।
শিক্ষক সংকটেও ধাক্কা
শিক্ষক মোহাম্মদ এনামুল হকের মতে, অনেক বিদ্যালয়ে দক্ষ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট তীব্র। কোথাও কোথাও যথাযথ যোগ্যতা ও নিবন্ধন না থাকা ব্যক্তিদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশ্ন খুব কঠিন ছিল–এমন দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং উত্তরপত্র মূল্যায়নে এবার তুলনামূলক কঠোরতা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, এবার খাতা দেখার ক্ষেত্রে আমরা অন্য বছরের তুলনায় বেশি স্ট্রিক্ট ছিলাম। নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রেও উদারতা কম ছিল।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ
ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রশ্নের ধরন ও মূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে। এক পরীক্ষার্থী জানায়, বিশেষ করে গণিতে প্রশ্নের কয়েকটি অংশ প্রস্তুতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। সময়ের মধ্যেও সব শেষ করা কঠিন হয়েছে।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, অন্য বিষয়গুলো ভালো হলেও একটি বিষয়ে খারাপ করায় পুরো পরীক্ষায় ফেল করতে হয়েছে। আগে বুঝতে পারলে ওই বিষয়ে আরও বেশি প্রস্তুতি নিতাম।
শূন্য পাসের স্কুল ৮
চলতি বছর আটটি বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৮৪ জন। গত বছর এমন বিদ্যালয় ছিল একটি, ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ছিল একটিও নয়।
শূন্য পাস করা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জারুলছড়ি হেডম্যান পাড়া হাই স্কুল, ভাইবোনছড়া গার্লস হাই স্কুল, মহালছড়ি হাই স্কুল, আন্ধার মানিক জুনিয়র হাই স্কুল, উড়িরচর জুনিয়র হাই স্কুল, তারাবুনিয়া হাই স্কুল, সুজাক দাজার বাজার জুনিয়র স্কুল ও নারায়ণহাট গার্লস হাই স্কুল।
এসব বিদ্যালয়ের বেশির ভাগই খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা, লংগদু, বাঘাইছড়ি ও বরকলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। রয়েছে সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল ও ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত এলাকাও।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব এলাকায় দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখা, নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে কম পরীক্ষার্থী থাকায় এসব বিদ্যালয়ের ফলাফলে পরিসংখ্যানগত ওঠানামাও বেশি হয়। তিন বা পাঁচজন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করলে পুরো বিদ্যালয়ের পাসের হার শূন্য হয়ে যায়।
বোর্ডের ব্যাখ্যা
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চট্টগ্রামের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ফল বিপর্যয়ের জন্য একটি কারণকে দায়ী করা যাবে না। বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট, শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও মূল্যায়ন- সবগুলো বিষয় বিশ্লেষণ করতে হবে। যেহেতু আজকেই মাত্র রেজাল্ট হয়েছে, বিষয়টি আমরা পর্যালোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।
তিনি বলেন, শূন্য পাস করা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তিন থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে ফলাফল আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে কোথায় শিক্ষকসংকট, কোথায় পাঠদানের ঘাটতি এবং কোথায় শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম–তা শনাক্ত করা প্রয়োজন।
বোর্ড সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাক্রমের পরিবর্তন ও পরীক্ষার আগে বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে পড়াশোনায় ব্যাঘাতের প্রভাবও থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহম্মদ আমির উদ্দিন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এবারের ফলাফল শুধু পাস-ফেলের হিসাব নয়; এটি চট্টগ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের সতর্কবার্তা। একটি বিষয়ে দুর্বলতার কারণে ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পুরো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে–সমস্যা শুধু পরীক্ষার হলে নয়, এর শিকড় আরও গভীরে। এখনই বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং প্রত্যন্ত বিদ্যালয়ে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা না গেলে আগামী বছরগুলোতেও এমন ফল বিপর্যয়ের ঝুঁকি থেকেই যাবে।


