রাজধানীতে আয়োজিত ‘কেমন পরিবেশ চাই’ শীর্ষক এক সংলাপে বক্তারা দূষণমুক্ত, নিরাপদ এবং সবার জন্য সমান সুযোগসম্পন্ন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ সংলাপ যৌথভাবে আয়োজন করে সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিস, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ, আর্থ সোসাইটি, এবং বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন।
সংলাপে বক্তারা বলেন, নদী দখল, বন নিধন এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দেশের জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
তারা পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমে পরিবেশগত ইস্যুকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে নিজের শিশুকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হন নাসির আহমেদ পাটোয়ারী।
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি পরিবেশ চাই, যেখানে আমার মেয়ে বড় হয়ে পরিবেশ রক্ষার জন্য আর সংগ্রাম করতে বাধ্য না হয়।’
আলোচনায় বাংলাদেশের পরিবেশ সংকটের বিভিন্ন দিক উঠে আসে, যার মধ্যে নদী রক্ষা, বন সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্য অবকাঠামোর অভাব উল্লেখযোগ্য।
বক্তারা বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় এখন অনেক ক্ষেত্রে কেবল কাগজ-কলম ও সাহিত্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে, বাস্তব চিত্র তার বিপরীত।
সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য হেমা চাকমা বলেন, ‘একজন মানুষ যেন সুস্থভাবে শ্বাস নিতে পারে, ঠিকভাবে ঘুমাতে পারে-বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, আমরা শুধু সেটুকুই চাই।’
নদী ও বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার একদিকে খাল পরিষ্কারের কথা বলছে, আবার অন্যদিকে নদীগুলো ধ্বংস হচ্ছে-এটা আমরা চাই না।’
তিনি টাঙ্গাইলের শালবন রক্ষা এবং খাগড়াছড়িতে বন্যপ্রাণী নিধনের ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার খবরে উদ্বেগও প্রকাশ করেন।
ভৌত অবকাঠামো সবার জন্য উপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে শিক্ষার্থী অপরাজিতা রক্তজবা বলেন, ‘আমরা একটি ইনক্লুসিভ পরিবেশ চাই। আমাদের ভবন ও অবকাঠামো কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য-সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।’
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা সাধারণত ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন, কিন্তু গবেষকদের জনসাধারণের সঙ্গে এ বিষয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।
নগর জীবনের দূষণ ও অবৈধ দখলের চিত্র তুলে ধরে জোবায়ের ইসলাম বলেন, ‘বাদামতলীতে রোজা রেখে পচা ফলের গন্ধ পাওয়া যায়-একটি শহরকে দূষিত করার মতো প্রায় সব উপাদানই সেখানে রয়েছে।’
কামরাঙ্গীরচর এলাকায় নদী ও খাল দখলের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকে গর্ব করে বলে পাঁচতলা ভবনের মালিক। অথচ সেই জায়গা আসলে খাল বা নদীর জায়গা।
গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জোবায়ের আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ক্রাইম ও রাজনীতির খবর যতটা গুরুত্ব পায়, পরিবেশের বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না।
তিনি বলেন, রাজনীতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নদী দখল, পরিবেশ দূষণ ও উন্মুক্ত জায়গা দখলের মতো বিষয়গুলোতে আরও বেশি সংবাদ কাভারেজ প্রয়োজন।
সংলাপে আয়োজকদের একজন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘কেমন পরিবেশ চাই’ সংলাপের মাধ্যমে জনগণের পরিবেশগত প্রত্যাশা তুলে ধরা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিবেশের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা কী-এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে এবং জনগণের পরিবেশ অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির লক্ষ্যেই আমরা এই সংলাপ আয়োজন করেছি।’


