নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলের নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে অনলাইনে আপত্তিকর প্রচারণার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বেশ কয়েকজন নারী প্রতিদ্বন্দ্বী অভিযোগ করেছেন, তাদের কণ্ঠ রোধ করতে সুসংগঠিতভাবে সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি ও চারিত্রিক অবমাননা চালানো হচ্ছে।
ঝালকাঠি-১ আসনের এনসিপি প্রার্থী মাহমুদা মিতুর দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনলাইন হয়রানি। ভুয়া ও বানোয়াট তথ্য ব্যবহার করে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অশ্লীল ছবি-সবই সইতে হচ্ছে তাকে।
মিতু জানান, তিনি প্রতিদিন এই পরিকল্পিত প্রচারণার শিকার হচ্ছেন। তার মতে, এসব আক্রমণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং রাজনীতিতে নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং তাদের জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার অপকৌশল। বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম এসব ভুয়া তথ্যের অসারতা প্রমাণ করলেও মিতুর আক্ষেপ, সংশোধনী আসার আগেই যা ক্ষতি হওয়ার, তা হয়ে যায়।
তিনি বলেন, মূল ভুয়া তথ্যটি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, ফ্যাক্ট-চেক বা সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে সেই তুলনায় পৌঁছায় না।
ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী সানজিদা তুলি জানান, সাইবার বুলিং এখন অনেক বেশি পদ্ধতিগত হয়ে উঠেছে। গত এক বছরে ‘বট’ নেটওয়ার্কের ব্যবহার অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন যেকোনো নারী নিজের মতামত দিলেই তাকে ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে।
‘নেটজ বাংলাদেশ’-এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৭৮ শতাংশের বেশি নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোনো না কোনো সময় প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ইউএন উইমেনের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনলাইন হয়রানি তীব্রভাবে বেড়েছে এবং ৬৬ শতাংশ নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন বা হুমকিমূলক বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
নারীদের হয়রানির এই চিত্র আরেকটি উদ্বেগজনক তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও আসন্ন সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা গত নির্বাচনের তুলনায় কমে গেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে নারী প্রার্থীর হার ছিল ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ, নারী প্রার্থীর হার কমেছে ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে ১০৮ জন নারী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭০ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সবাই একটি ‘নতুন বাংলাদেশের’ কথা বললেও বাস্তবে নারীরা দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থাকলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সমান সুযোগ পেতেন এবং সেখানে লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষের স্থান থাকত না।
নাটোর-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের দাবি, যারা ভুয়া বট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এসব অপরাধ করছে, তাদের পরিচয় প্রকাশ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে অন্যরা এ ধরনের সাহস পাবে না।
গত ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় নারী প্রার্থীরা তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ঢাকা-৮ আসনের গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী মেঘনা আলম সেখানে বলেন, এই হয়রানি নারীদের স্তব্ধ করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। সভায় অংশ নেওয়া প্রার্থীরা ডিজিটাল অপব্যবহার রোধে দ্রুত কাঠামোগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা অনলাইন হয়রানির শিকারদের সহায়তায় একটি ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা দ্রুত সেবা ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি মানহানিকর কনটেন্ট ঠেকাতে মেটা ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।
‘রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশ’-এর সিনিয়র ফ্যাক্ট-চেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন, নারীদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে এবং তাদের মুখ বন্ধ রাখতে সুসংগঠিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। অনলাইন প্রোপাগান্ডা রোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।


