নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইরান যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের কৌশল

নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইরান যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের কৌশল
Advertisement
Advertisement

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান-বিরোধী সামরিক অভিযানের আগের পৃথিবী এবং বুধবার যুদ্ধ অবসানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিটির পর উদ্ভূত নতুন পৃথিবীর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ইরান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরের সব কৌশলগত সমীকরণকে বদলে দিয়েছে, যার প্রভাব যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই সংঘাতে ইরানকে মূল সুবিধাভোগী হিসেবে দেখা হোক বা না হোক,  যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্য, আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্য এবং বিশ্ব সুরক্ষা স্থাপত্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণাগুলোকে নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এর প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি কূটনৈতিক জোট, বাণিজ্য ধারা, জ্বালানি সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কও নতুন আকারে গড়ে তুলবে এবং বিশ্ব সুরক্ষা স্থাপত্যে পরিবর্তন আনবে।

বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধবিরতি একটি স্বস্তির বিষয়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে তা দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি আমদানি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর চাপ আরও তীব্র করে তুলত। জ্বালানি সরবরাহ, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং শ্রমিক অভিবাসনে স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘ যুদ্ধ হলে তা আরও অনেক বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারত।

বিশ্বজুড়ে সরকারগুলো এখন তাদের কৌশল নতুন করে যাচাই করছে এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।

নতুন বাস্তবতা

ইরান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কিত বেশ কিছু মূল ধারণা আমূল বদলে দিয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেছে, ইসরায়েল সম্পর্কে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে, বিদ্যমান সুরক্ষা স্থাপত্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি সমীকরণ নতুন করে সাজিয়েছে।

এই পরিবর্তনগুলো বিভিন্ন অঞ্চলের পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সামরিক শক্তি ও অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সামরিক শক্তি হিসেবে তার অবস্থান বজায় রেখেছে। ইসরায়েলকেও এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই সংঘাত প্রমাণ করেছে যে কেবল সামরিক শক্তির আধিক্যই কৌশলগত সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না।

ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের ধারাবাহিক সামরিক অভিযান সত্ত্বেও ইরান ড্রোন, মিসাইল এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যের দেশীয় অস্ত্র দিয়ে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়ে যায়, যা তাদের সহনশীলতা ও কৌশলগত স্থিতিস্থাপকতার প্রমাণ দেয়।

এই সংঘাত আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেছে: ছোট শক্তিগুলো অপ্রতিসম কৌশল, প্রস্তুতি এবং ক্ষতি সহ্য করার সক্ষমতার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকার ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারে। এটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সামরিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ওপর যে বিপুল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য চাপিয়ে দেয়, সেটাও তুলে ধরেছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে বিভিন্ন মাত্রায় রাজনৈতিক, গোয়েন্দা এবং কূটনৈতিক সহায়তা পেয়েছে, যা এই সংঘাতকে ঘিরে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।

ইসরায়েল সম্পর্কে বদলে যাওয়া মনোভাব

এই সংঘাত ইসরায়েল সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ধারণাকেও প্রভাবিত করেছে। গাজা এবং অন্যত্র তার সামরিক অভিযান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ইসরায়েল পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের কাছ থেকে দৃঢ় কূটনৈতিক সমর্থন পেয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক এই সংঘাত তার ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের মধ্যে বাড়তে থাকা বিভাজন প্রকাশ করে দিয়েছে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইসরায়েলের কিছু কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, আর কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং মানবিক রেকর্ড নিয়ে ক্রমশ সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছে।

ইসরায়েল এখনো কিছু আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলেও তার কূটনৈতিক অবস্থান অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রশ্নের মুখে সুরক্ষা স্থাপত্য

এই সংঘাত বিশ্বের মূল সুরক্ষা প্রদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলেছে। কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। আঞ্চলিক মিত্ররা মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং মূলত এই ধারণার ভিত্তিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিয়েছে যে ওয়াশিংটন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।

ইরান সংঘাত উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে এই ধারণাগুলো নতুন করে যাচাই করতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সুরক্ষা সহযোগিতা ছেড়ে দেওয়ার তেমন কোনো তাৎক্ষণিক আভাস না থাকলেও এই সংঘাত আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে কৌশলগত বৈচিত্র্য আনতে এবং স্বনির্ভরতার ওপর আরও বেশি জোর দিতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি সমীকরণ

আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক আরব রাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার শিকার ইরান বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও যথেষ্ট সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এই সংঘাতের পরিণতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন থাকলেও তেহরান একটি প্রধান আঞ্চলিক সামরিক শক্তি হিসেবে তার ভাবমূর্তি আরও জোরদার করেছে, যার সক্ষমতাকে উপেক্ষা করা যায় না।

ইয়েমেনের হুথি এবং লেবাননের হিজবুল্লাহসহ মিত্র অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ইরানের প্রভাব এখনো আঞ্চলিক সুরক্ষা সমীকরণকে রূপ দিচ্ছে।

পরিবর্তিত কৌশলগত পরিবেশ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে তাদের কূটনৈতিক ও সুরক্ষা নীতি নতুন করে সাজাতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রভাব

বাংলাদেশ এই সংঘাতের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব মোটামুটি ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সারসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন নতুন সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছিল। সংকটকালে ভারতসহ মিত্র দেশগুলোর সহায়তা জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়েছিল।

রেমিট্যান্স প্রবাহ সবল ছিল। জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এই বৃদ্ধির পেছনে অনিশ্চয়তার মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্কতামূলক অর্থ প্রেরণ এবং দুই ঈদ উপলক্ষে মৌসুমি রেমিট্যান্সের প্রভাব থাকতে পারে।

তবে শ্রমিক অভিবাসন যথেষ্ট কমে গিয়েছে। বছরের প্রথম পাঁচ মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমে প্রায় তিন লাখ ১৪ হাজারে নেমে আসে; এ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং বাহরাইনের শ্রমবাজার বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মূলত বন্ধ থাকে। সৌদি আরব, কুয়েত এবং কাতার শ্রমিক নিয়োগ অব্যাহত রাখে।

আরও পড়ুন: যা আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে

সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে উপসাগরীয় অর্থনীতিগুলো ঘুরে দাঁড়ালে বৈদেশিক নিয়োগের গতি বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

কূটনৈতিকভাবে, সংকটকালীন পুরো সময়ে বাংলাদেশ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। শীর্ষ পর্যায়ে টেলিফোন আলাপসহ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এই অঞ্চলের সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ঢাকার প্রচেষ্টার প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সব দেশে সফর করে তাদের প্রতি ঢাকার সংহতি প্রকাশ করেন, যা তারা সাদরে গ্রহণ করে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নিকট ভবিষ্যতে উপসাগরীয় কোনো একটি দেশ সফর করতে পারেন।

সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে নেওয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোকেও বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রতিরক্ষা শিক্ষা

সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষাটি নিহিত রয়েছে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার মধ্যে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে আবর্তিত এই সংঘাত আধুনিক যুদ্ধে প্রচলিত নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি প্রমাণ করেছে। বড় আকারের সারফেস যুদ্ধজাহাজ এখন নির্ভুল লক্ষ্যভেদী মিসাইল, ড্রোন, সাবমেরিন এবং নৌ-মাইনের মুখে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশের মতো সামুদ্রিক রাষ্ট্র, যাদের ব্যাপক উপকূলীয় জলরাশি এবং সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করতে হয়, তাদের জন্য সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার নতুন করে যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

আরও পড়ুন: যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক সই

মূলত ব্যয়বহুল সারফেস নৌবহরের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশ দেশের ভূগোল অনুযায়ী উপকূলীয় মিসাইল ব্যবস্থা, ড্রোন, সাবমেরিন, নজরদারি সক্ষমতা এবং সমুদ্র-প্রতিরোধী সম্পদকেন্দ্রিক একটি অধিক ব্যয়সাশ্রয়ী সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল গ্রহণ করে লাভবান হতে পারে।

আধুনিক যুদ্ধে নিরেট সামরিক আকারের চেয়ে নমনীয়তা, সহনশীলতা এবং সাশ্রয়িতা ক্রমেই বেশি মূল্য পাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য পরিবর্তনশীল সুরক্ষা পরিবেশ একটি সুযোগ তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার, পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত বিশ্বে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad