আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও অপরাধমূলক তৎপরতা দমনে নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠোর অবস্থানে নেমেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
বন্দরনগরীর রাজনীতি ও অপরাধ জগতের সাথে সংশ্লিষ্ট ৩২৯ জন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে তাদের শহর থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আগামী দুই বছর পর্যন্ত তাদের চট্টগ্রামে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে পুলিশ।
বহিষ্কৃতদের তালিকায় বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী হলেও এতে বিএনপি নেতাকর্মীদেরও নামও রয়েছে। এ ছাড়া আছে কারাবন্দী ইসকন গুরু চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নাম।
বিএনপি সূত্র নিশ্চিত করেছে, তাদের দলের অন্তত এক ডজন নেতাকর্মীর নাম এই তালিকায় আসায় দলের ভেতরে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নজিরবিহীন আদেশ জারি করা হয়। এর ফলে নির্বাচনের আগে পুরো চট্টগ্রাম মহানগরী কার্যত একটি কঠোর নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত হয়েছে।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ১৯৭৮ সালের সিএমপি অধ্যাদেশের ৪০, ৪১ ও ৪৩ ধারা একযোগে প্রয়োগ করা হয়েছে। বিরল এই আইনি ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভাব্য জননিরাপত্তা হুমকিদের শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা একে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন। যাতে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদ ও নির্বাচনী সহিংসতা রাজপথে ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সিএমপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা তথ্য ও অপরাধীদের রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধি জননিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। নির্বাচনের সময় তারা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রমতে, এই ৩২৯ ব্যক্তিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা সহিংসতা উসকে দিতে, ভোটারদের ভয় দেখাতে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টিতে সক্ষম।
সিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এটি কোনো প্রথাগত পুলিশি কাজ নয়; বরং রাজপথে সহিংসতা শুরু হওয়ার আগেই তা অঙ্কুরে বিনাশ করার একটি কৌশল।
কঠোর আইনের নজিরবিহীন প্রয়োগ
এই পুরো অভিযানটি পরিচালিত হচ্ছে ১৯৭৮ সালের সিএমপি অধ্যাদেশের এমন কিছু ধারার ভিত্তিতে, যা সচরাচর ব্যবহৃত হয় না। এর ৪০ ধারা অনুযায়ী কোনো দল বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হলে তাদের বহিষ্কার করা যায়। ৪১ ধারা জননিরাপত্তার স্বার্থে সন্দেহভাজনদের শহর থেকে সরানোর ক্ষমতা দেয় এবং ৪৩ ধারা অনুযায়ী এই নিষেধাজ্ঞা দুই বছর পর্যন্ত বলবৎ রাখা যায়।
সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ নিশ্চিত করেছেন যে, এই প্রথমবারের মতো তিনটি ধারা সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
রাজনীতিতে তোলপাড়
এই তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। তালিকায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র ও সাবেক কাউন্সিলরদের পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদী চক্রের সদস্যদের নামও রয়েছে। উল্লেখযোগ্য, ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী ও তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য এম আব্দুল লতিফ। এ ছাড়া তালিকায় সিটি কর্পোরেশনের ৪০ জন সাবেক কাউন্সিলর এবং যুবলীগ-ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতাদের নাম রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, বহিষ্কৃত অনেকের বিরুদ্ধেই জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হত্যা ও নির্যাতনের মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। পুলিশের দাবি, তালিকায় থাকা অনেক ব্যক্তি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন, যা রাজনীতিতে অপরাধীদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তালিকায় মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শওকত আজম খাজার নাম তালিকার চার নম্বরে থাকায় বিএনপিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। খাজা অভিযোগ করেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই তালিকায় তাদের নেতাকর্মীদের নাম ঢোকানো হয়েছে। বিষয়টি দলের হাইকমান্ড ও প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এই তালিকায় ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ আলী খানের নাম রয়েছে। জানা গেছে, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে আছেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তার নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে। তালিকায় তার সহযোগী সাজ্জাদ হোসেনের নামও রয়েছে, যিনি ‘ছোট সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত এবং বর্তমানে রাজশাহী কারাগারে বন্দী। এ ছাড়া ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না, যিনি ফেনী কারাগারে আছেন, তার নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সম্পাদক মোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, এই ব্যক্তিদের কেউ বর্তমানে শহরে নেই। তিনি আরও জানান, পুরো তালিকাটি পর্যালোচনার পর দল তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে।
প্রাথমিকভাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তারা দাবি করেন, বহিষ্কারাদেশে নাম থাকা ৩২৯ জনের কেউই তাদের দলের সঙ্গে যুক্ত নন।
এদিকে জিরো টলারেন্সের হুঁশিয়ারি সিএমপি স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বহিষ্কৃত কেউ যদি শহরে প্রবেশের চেষ্টা করে, তবে তাকে তাৎক্ষণিক আটক করে বের করে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে নতুন মামলা দেওয়া হবে।
কমিশনার হাসিব আজিজ বলেন, ‘জনসাধারণের জানমাল রক্ষা করতেই এই কঠিন সিদ্ধান্ত। শহরবাসীর জন্য যাদেরকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তারা দুই বছর চট্টগ্রামের সীমানার বাইরে থাকবে। আইন অমান্যকারী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা
গত ১৫ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিই পুলিশকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। সম্প্রতি আইনজীবী আলিফ হত্যাকাণ্ড এবং এক শীর্ষ বিএনপি নেতার ওপর গুলিবর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনাগুলো শহরকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
পুলিশের তথ্যমতে, গত ১৫ মাসে চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরীতে প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এই পরিস্থিতিতে সিএমপি রাজপথে পুলিশের হাতে সাব-মেশিনগান দিয়েছে। সশস্ত্র অপরাধীদের দেখা মাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অনেক দাগী অপরাধী দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হওয়ায় শহর থেকে বহিষ্কার এখন শান্তি রক্ষার শেষ পথ হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে।


