মাগুরার মোহাম্মদপুর ও ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মানুষের বহুকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের প্রতীক মধুমতি সেতু। একসময় যে সেতুকে ঘিরে উন্নয়ন, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের গল্প লেখা হয়েছিল, আজ সেই সেতুই যেন রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের করুণ ব্যর্থতার এক নীরব স্মৃতিস্তম্ভ। দিনের আলোয় যার সৌন্দর্য পথচারীদের মুগ্ধ করে, রাত নামলেই সেই সেতু ডুবে যায় এমন এক অন্ধকারে, যেখানে উন্নয়নের ভাষণ হারিয়ে যায় বাস্তবতার তীব্র বিদ্রুপে।
প্রায় ৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬০০ দশমিক ৭০ মিটার দীর্ঘ মধুমতি সেতুটি ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর উদ্বোধনের সময় ছিল এ অঞ্চলের মানুষের গর্ব। পদ্মা সেতুর সংযোগপথ হিসেবে এর গুরুত্ব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ হাজারো যানবাহন এই সেতু ব্যবহার করে। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য, কোটি কোটি টাকার এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি স্ট্রিট লাইটও গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে জ্বলছে না।
মনে হয়, উন্নয়নের এই ঝলমলে যুগে মধুমতি সেতুর আলোগুলোই কেবল অন্ধকারের সঙ্গে আপস করে বসেছে। যে সেতু হওয়ার কথা ছিল নিরাপদ যাত্রার প্রতীক, সেটিই এখন সন্ধ্যার পর পরিণত হয় এক ভৌতিক করিডোরে। অন্ধকার যেন এখানে শুধু আলোর অনুপস্থিতি নয়, বরং দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও জবাবদিহিতাহীনতার প্রতিচ্ছবি।
মধুমতি সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রাণবন্ত পর্যটন কেন্দ্র। নদীর দুই তীরে সারি সারি রেস্টুরেন্ট, ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিনোদনের আয়োজন, ভ্রাম্যমাণ খাদ্য বিক্রেতাদের কোলাহল থেকে পংকজ সব মিলিয়ে এলাকাটি স্থানীয়দের কাছে পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি কক্সবাজার’ হিসেবে। ঈদ বা উৎসব এলে মানুষের ঢল নামে এখানে। কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাণচাঞ্চল্যকে গিলে খায় এক গভীর অন্ধকার।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর দুই পাশে স্থাপিত সবগুলো স্ট্রিট লাইট দীর্ঘদিন ধরে অচল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকা নিমজ্জিত হয় ঘুটঘুটে অন্ধকারে। ফলে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও পর্যটকদের মধ্যে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্ধকারের সুযোগে এখানে মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধচক্রের আনাগোনা বেড়েছে। ছিনতাই, মাদক লেনদেন ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সেতুটি যেন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মমিন মুসল্লি বলেন, ‘দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো লাইট জ্বলে না। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা ভুতুড়ে পরিবেশে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ এখন প্রয়োজন ছাড়া এ পথ এড়িয়ে চলে। অথচ মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য যেন এটি স্বর্গরাজ্য।’
মো. ইমামুল ইসলাম নামে এক যুবক বলেন, ‘প্রায়ই এই পথে যাতায়াত করি। কিন্তু সন্ধ্যার পর চলাচলে ভয় কাজ করে। মনে হয় কখন কী ঘটে যায় বলা যায় না।’
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে সমস্যাটির কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানেন, কিন্তু সমাধান যেন কাগজের ফাইলেই আটকে আছে। জানা গেছে, বাতি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
উপজেলা প্রকৌশলী ও মোহাম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দুজনেই বলেন, ‘সার্ভিস তার ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ চলছে এবং খুব দ্রুত লাইটগুলো পুনরায় চালুর ব্যবস্থা করা হবে।’
মধুমতি সেতুর অন্ধকার আজ কেবল কয়েকটি নষ্ট বাতির গল্প নয়। এটি আমাদের রক্ষণাবেক্ষণ সংস্কৃতির দুর্বলতা, দায়িত্ববোধের সংকট এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেগুলোর দেখভালে চরম উদাসীনতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই অন্ধকারের অবসান ঘটুক। মধুমতি সেতু আবারও আলোয় ফিরুক, নিরাপত্তায় ফিরুক, আর হয়ে উঠুক উন্নয়নের প্রতীক।


