প্রতিষ্ঠার দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখনো তার মূল লক্ষ্য—রাষ্ট্রের সব স্তরে স্বাধীনভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই—পূরণ করতে পারেনি। বরং সরকার ও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দিনদিন ক্ষমতা হারিয়েছে। যাদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা, তাদের হাতেই বন্দী হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরু থেকেই দুদকের বড় ঘাটতি ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ক্ষমতাসীনরা কখনোই দুদককে সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ চায় না। সংকটের মধ্যে জন্ম, রাজনীতির শিকলে বন্দী
মূলত দাতা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-অংশীদারদের চাপের মুখে ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন পাস করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। গঠন হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখন বাংলাদেশের ভয়াবহ দুর্নীতি সূচকের প্রেক্ষাপটে দুদককে দেখানো হয় নতুন যুগের সূচনা হিসেবে। যেখানে স্বাধীন, দৃঢ় এবং রাজনৈতিক নির্দেশনা থেকে মুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে দুদক।
২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি দমনে কোমর বেঁধে নামে দুদক। দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়। এতে অনেকের মধ্যে বিশ্বাস জন্মায়, ‘রুই-কাতলা’রা আর ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়।
কিন্তু অবস্থা দ্রুত বদলে যায়। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মামলার যোগ্যতার বিচার না করেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা উচ্চ আদালতের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার মামলাগুলো রয়ে যায়। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে খালেদা জিয়ার বাকি মামলাগুলো খারিজ করে দেওয়া হয়। এতে আবারও দীর্ঘদিনের সেই ধারণা-ই পোক্ত হয়, বাংলাদেশে জবাবদিহি আইনের ওপর নয়, বরং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল।
‘নখদন্তহীন কাগুজে বাঘ’
দুর্নীতি নিয়ে গবেষকরা দুদককে প্রায়ই ‘কাগুজে বাঘ’ বলেন, আইনে যাকে শক্তিশালী দেখালেও বাস্তবে যার কার্যকর ক্ষমতা বা স্বাধীনতা নেই। ২০০৯ সালে নিয়োগ পেয়ে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দুদককে ‘দন্তহীন বাঘ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন তখনকার দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। এখনো তিনি সেই মতেই অনড়। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরাসরি নির্দেশনা না দিলেও কমিশনাররা নির্বাচিত হন এমনভাবে, যাতে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান না নেন। ফলে দুদক কখনোই ক্ষমতাসীন দল বা তাদের প্রভাবশালী সহযোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত চালায়নি।
এমনকি দুদকের অভ্যন্তরীণ সততাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বহু বছর ধরে দুদক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুদক এসব পুরোপুরি মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির নৈতিক কর্তৃত্বও দুর্বল করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই ধারা
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনমনে আশা তৈরি হয়, দুদকের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমবে। কিন্তু ১৫ মাস পার হলেও উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের প্রতি দুদকের আচরণ বদলায়নি।
বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল মোমেনের অধীনে দুদক আগের মতোই মূলত সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের টার্গেট করছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিতন দুর্নীতির চক্রগুলোকে প্রায় ষ্পর্শ করে না।
বিশ্লেষকদের মতে, যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, দুদক স্বভাবগত কারণে নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এই প্রবনতা দুদকের মধ্যে গভীরভাবে গেঁথে গেছে।
লম্বা সময়ের মামলা, শাস্তি কম
দুদক যে সব ক্ষেত্রে মামলা করেছে, সেগুলোও জনগণের আস্থা অর্জনে খুব কমই সফল হয়েছে। আদালতে একটি মামলার নিষ্পত্তি হতে ৮ থেকে ১০ বছর লেগে যায়। এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়, সাক্ষীরা অনুপস্থিত থাকেন, আর অভিযোগের গুরুত্বও জনমনে ম্লান হয়ে পড়ে।
দণ্ডের হারও কম—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাত্র প্রায় অর্ধেক। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি মামলা আদালতে ঝুলে ছিল।
‘কারও বেলায় জবাবদিহি, করও বেলায় নিরাপত্তা-বলয়’
দুদক আইনে রাষ্ট্রের সব স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মাঝারি পর্যায়ের আমলা ও বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। অথচ ক্ষমতাসীনদের শীর্ষ পর্যায় বা প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।
দুদকের অভ্যন্তরীণ ‘গ্রেডিং সিস্টেম’কে মামলা বাছাইয়ের যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়। তবে সমালোচকরা বলেন, এই গ্রেডিং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের বাঁচাতে এবং প্রভাবহীনদের টার্গেট করতেই বেশি ব্যবহার হয়েছে।
আস্থার সংকট
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশের অবনমন, যা এখন এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়—দুদকের ব্যর্থতাকেই স্পষ্ট করে। জনগণের চোখে দুদক এখন আর জবাবদিহির প্রহরী নয়; বরং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক কাঠামোরই প্রতিচ্ছবি।
কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
অবস্থা পরিবর্তনে বিশ্লেষকরা দুদকের যেসব সংস্কারের কথা বহু বছর ধরে বলে আসছেন, তার মধ্যে রয়েছে—চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত মেধাভিত্তিক পদ্ধতি; সিনিয়র আমলাদের আধিপত্য কমানো, যাতে সম্ভাব্য তদন্তের আওতাভুক্ত ব্যক্তিরাই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারেন; দুদককে আর্থিক, প্রশাসনিক ও তদন্তে পুরোপুরি স্বাধীনতা প্রদান এবং দুর্নীতি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠন। কিন্তু এসবই বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যা বাংলাদেশে কখনো প্রকৃতভাবে দেখা যায়নি।
যেমন রাষ্ট্র, তেমন প্রতিষ্ঠান
দুই দশকেরও বেশি সময় পর দুদকের রেকর্ড একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে: দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান তখনই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেটিকে স্বাধীন হতে দেয়। যত দিন পর্যন্ত সরকারগুলো দুদককে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, তত দিন প্রতিষ্ঠানটি অচলই থাকবে।
এক সাবেক কমিশনার যেমন বলেছেন, ‘কেবল আইন দিয়ে প্রতিষ্ঠান স্বাধীন হয় না। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা স্বাধীনতা দিতে চাইলে তবেই হয়।’
দুই দশক পরও দুদক দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গাতেই—গঠনগতভাবে দুর্বল, রাজনৈতিকভাবে অনুগত, এবং জনগণের আস্থাহীন।


