২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে গিয়েছিল ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দী। তার মধ্যে ১ হাজার ৫৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখনো পলাতক রয়েছে ৬৯০ জন বন্দী। এর মধ্যে শুধুমাত্র নরসিংদী কারাগার থেকে ৮২৬ জন পালালেও ১৬৬ জনের কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত কারা অধিদপ্তরের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কারা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
কারাগারে মাদক ঢুকছে এবং কারারক্ষীরা এসব কাজে সহায়তা করছেন এ বিষয়ে করা প্রশ্নে বলেন, ‘মাদক এবং আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। মাদক সংক্রান্ত অপরাধে কেউ যদি জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদের জন্য আমরা অত্যন্ত কঠোর ছিলাম।’
তিনি জানান, গত দুই বছরে এসব কারণে ২১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮২ জনকে চাকরিচুত করা হয়েছে। ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে নানামুখে বিভাগীয় মামলা ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ছোটখাটো অপরাধের কারণে ৩০৩ জনকে প্রশাসনিক কারণে বিভিন্ন বিভাগের বাইরে প্রেরণ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কোন কারারক্ষী যদি মাদক সংক্রান্ত কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তাকে আমরা ফৌজদারি মামলা দিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করছি।’
৫ আগস্ট কারাগার থেকে কতজন বন্দী এবং জঙ্গি পালিয়ে গেছে এবং কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানতে চাইলে আইজি প্রিজন বলেন, ‘প্রায় ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দী পালিয়ে যায়। আমাদের হিসাবে প্রায় ৬৯০ জন বন্দী এখনো পলাতক। এর মধ্যে ১৬৬ জনের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য আমরা এখনো পাইনি। তারা নরসিংদির কারগার থেকে পালিয়েছিল। সেখানে সব নথিপত্র এবং সার্ভার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাদের বিষয়ে জানতে আদালতের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে।’
পলাতক জঙ্গিদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কারাগার থেকে মোট ৯ জন তালিকাভুক্ত জঙ্গি পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে ৬ জনকে আবার আটক করা হয়েছে। এদের একজন জুয়েল ওস্তাদ জামিনে বের হয়েছিল। সম্প্রতি তাকে পুলিশ আবার গ্রেপ্তার করেছে। তবে এখনো তিনজন জঙ্গি পলাতক রয়েছে।’
সম্প্রতি রাজধানী ও এর আশপাশে বোমা ও বোম সদৃশ বস্তু পাওয়ার সঙ্গে পলাতক জঙ্গিদের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোর সঙ্গে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দীদের কোনো ধরনের সংযোগ আছে কি না, সেটা নিয়ে আমরাও কিছুটা চিন্তিত। তাদের বিষয়ে আমরা কাজ করছি।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার জুয়েল ওস্তাদের সঙ্গে পলাতক বোমারু মামুনের কারাগারে সম্পর্ক হয়েছিল। এসব জঙ্গিদের কারাগারে একসঙ্গে রাখার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, ‘আসলে এটি আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আপনারা জানেন, আমাদের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় দুই হাজারের অধিক বন্দীর জন্য হলেও বাস্তবে সেখানে অনেক বেশি বন্দী অবস্থান করছেন। ফলে আবাসন আমাদের একটি বড় সমস্যা।’
আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা কারাগারে থেকেই কারারক্ষীদের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার হচ্ছে না—এ কথা আমি ১০০ শতাংশ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারছি না। তবে একই সঙ্গে আমরা কোনোভাবেই এ বিষয়ে ছাড় দিচ্ছি না।’
সম্প্রতি পুলিশের বিশেষ অভিযানে অনেকে গ্রেপ্তার হচ্ছে। এতে কারগারে বন্দী ব্যবস্থাপনা কিভাবে হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বন্দী নিয়ে কাজ করি। কিন্তু সম্প্রতি এই সংখ্যা বেড়েছে। আজকে আমাদের প্রায় ৯৮ হাজার বন্দী আছে। যেখানে মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার বন্দী। গতকালের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দী আসছেন এবং প্রায় ৩ হাজার জন বেরিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ প্রতিদিনই এভাবে বন্দীর আসা-যাওয়া চলছে। দুই লাখের কাছাকাছি যে সংখ্যা নিয়ে বলা হচ্ছে, তার বড় অংশই আসা-যাওয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে যে ব্যালেন্সটা থেকে যাচ্ছে, সেটাই আমাদের মোট বন্দীর সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
বর্তমানে কারাগারে কতজন বিদেশি বন্দী আছে জানতে চাইলে সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের কারাগারে মোট ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দী রয়েছেন। এর মধ্যে ১৭০ জনের সাজা শেষ হয়ে গেছে এবং তারা নিজ নিজ দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন। তাদের বিভিন্ন দূতাবাস এবং সরকারের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে ‘
বিদেশি বন্দী মারা গেলে তাদের মরদেহ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত দুই বছরে আমরা প্রায় ১৭টি বিদেশি বন্দীর মরদেহ ব্যবস্থাপনা করেছি। এর মধ্যে দুটি মরদেহ ভারতে ফেরত পাঠাতে পেরেছি। বাকিগুলো আমরা এখানে সংরক্ষণ করেছি। আমাদের একটি নীতিমালা রয়েছে—সাধারণত তিন মাস পর মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের তিনটি মরদেহ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমরা আশা করছি, সরকার সিদ্ধান্ত দিলে তাদের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেহেতু তাদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে কেউ মরদেহ নিতে আসছে না, তাই নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।’


