‘দীপু নাম্বার টু’: এক অনুভূতির নাম

‘দীপু নাম্বার টু’: এক অনুভূতির নাম
'দীপু নাম্বার টু'-এর প্রধান দুই অভিনয়শিল্পী শুভাশীষ ও অরুণ সাহা (বাম থেকে)
Advertisement
Advertisement

স্বাধীন দেশে প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। ১৯৮৬ সালে ছবিটি মুক্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। এর অধিকাংশই শিশু-কিশোরদের মন টানতে পারেনি।

তবে ‘দীপু নাম্বার টু’ ব্যতিক্রম। সম্ভবত এটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশুতোষ চলচ্চিত্র। শুধু জনপ্রিয়তা নয়, নির্মাণমানেও ছবিটি অনেক এগিয়ে।

‘দীপু নাম্বার টু’-এর ছবির পোস্টার ও বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: কোলাজ

‘দীপু নাম্বার টু’ প্রথমে কিশোর উপন্যাস। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা গল্পটি ১৯৮১ সালে ‘কিশোর বাংলা’ ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে বই আকারে আসে। পরে সেই গল্পে পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম ১৯৯৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর চলচ্চিত্র তৈরি করে মুক্তি দেন।

গল্পের প্রধান চরিত্র দীপু নাকি লেখকের মাথায় ‘ভর করেছিল’। জাফর ইকবালের ভাষায়, তিনি যখন পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে যান, তখন সেখানে তিনি পুরোপুরি একা। বাংলায় কথা বলার মতো একজন মানুষও ছিলেন না। পড়াশোনার তীব্র চাপ, সিয়াটলের মেঘলা আকাশ, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি আর কনকনে ঠান্ডা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল মন খারাপের নিঃসঙ্গ পরিবেশ। সেই একাকিত্ব কাটাতে তিনি কল্পনায় একটি কিশোর চরিত্র বানান ‘দীপু’। মন খারাপ হলে কল্পনার সেই কিশোর তাকে সঙ্গ দিত।

দীপু যখন ক্লাসে প্রথম প্রবেশ করল। ছবি: সংগৃহীত

পারিবারিক কারণে দীপু বেশ একা। মা তার সঙ্গে থাকেন না, সে বড় হয়েছে বাবার কাছে। বাবার আবার একই জায়গায় তিন মাসের বেশি থাকতে ভালো লাগে না। তবু ছেলের জন্য তিনি বছরখানেক কোথাও থাকেন। তাই প্রায় প্রতি বছরই দীপুকে স্কুল বদলাতে হয়। এবার সে নতুন এক স্কুলে এসেছে, আর সেখানে পরিচয় দুষ্টু প্রকৃতির তারিকের সঙ্গে। ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একসময় বন্ধুরা মিলে বনে ঘুরতে গিয়ে তারা ধরা পড়ে এক ভয়ংকর পাচারকারী চক্রের সামনে।

আরও পড়ুন

ছবিটি প্রথমে নির্মাণ করার কথা ছিল প্রখ্যাত পরিচালক সাইদুর রহমান টুটুলের। ২০১৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মোরশেদুল ইসলাম ছবিটি বানানোর ইচ্ছে প্রকাশ করলে তিনি সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। শুধু অসাধারণ পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম বা সম্পাদক টুটুলই নন, এই ছবিকে কালজয়ী করে তোলার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সত্য সাহার সংগীত পরিচালনা এবং কিংবদন্তী অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি: বুলবুল আহমেদ, ববিতা, আবুল খায়ের, গোলাম মুস্তাফা, ডলি জহুর।

ছবিতে দীপুর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা। ছবি: সংগৃহীত

১৯৯৬ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘দীপু নাম্বার টু’ দুটি বিভাগে পুরস্কার পায় সেরা শিশু অভিনেতা (অরুণ সাহা) এবং সেরা পার্শ্ব অভিনেতা (বুলবুল আহমেদ)।

দীপু আর তারিক–অরুণ সাহা আর শুভাশীষের সেই প্রাণবন্ত দুই চরিত্র আজও দর্শকের মনে আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে। গল্পের শেষে স্কুল বদলের কারণে দুজনের বন্ধুত্বে যে বিচ্ছেদ আসে, সেটা কোনো কিশোর মনেই সহজে ধরা সয়ে যায় না। দীপু আর তার মা রওশনের মান-অভিমানের টানাপড়েন যেন মনে করিয়ে দেয় সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহ কতটা নিঃশর্ত, কতটা প্রয়োজনীয়।

‘দীপু’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

এটি নিছক একটি ছবি নয়। শৈশবের স্কুলজীবন, বন্ধুদের সঙ্গে ছোটখাটো লড়াই, একসঙ্গে খেলাধুলার উচ্ছ্বাস, অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস, আর বাবা-মায়ের মমতা নতুন করে বুঝে ওঠা| সব মিলিয়ে ‘দীপু নাম্বার টু’ আমাদের ভেতরে চির দিনের মতো জায়গা করে নেয়। এটা স্মৃতি, অনুভূতি, আর বেড়ে ওঠার এক অংশ হয়ে থাকে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad