দখল, দূষণ আর চরম অযত্নে টাঙ্গাইল শহরের বুক চিরে বয়ে চলা ২৭টি খাল এখন বিলুপ্তির পথে। এক সময় এই খালগুলোর সাথে টাঙ্গাইল শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত লৌহজং নদীর সরাসরি সংযোগ ছিল। তবে সময়ের বিবর্তনে সেই চিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। অবৈধ দখলের থাবায় বেশ কয়েকটি খালের অস্তিত্ব এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।
টাঙ্গাইল পৌরসভা অনেকগুলো খালকে ড্রেনে রূপান্তর করেছে। এমনকি ড্রেনের ওপর মার্কেট নির্মাণ করে তা বিক্রিও করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে দখল আর দূষণের কারণে লৌহজং নদী এখন মৃতপ্রায়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই খালগুলো দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছে সচেতন নাগরিক সমাজ।
শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শ্যামাবাবুর খালটি এখন একটি সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এটি এখন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় এই ড্রেনের দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক ঢেকে চলাচল করতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, বিলুপ্ত খালগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সবার আগে লৌহজং নদী দখলমুক্ত করতে হবে। একই সাথে নদীটি পুনঃখনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কাশিনগর এলাকায় লৌহজং নদীর উৎসমুখ অবস্থিত। ধলেশ্বরী নদী থেকে এই নদীর উৎপত্তি হয়েছে। প্রায় ৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মির্জাপুর উপজেলার বংশাই নদীতে মিশেছে।
নব্বইয়ের দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্পের আওতায় নদীর উৎসমুখে স্লুইস গেট নির্মাণ করে। এরপর থেকেই সেখানে পলি ও বালি জমতে শুরু করে। এতে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যায়। ফলে নদীটি ক্রমশ দখল আর দূষণের কবলে পড়ে যায়। গত কয়েক দশকে লৌহজং নদী অনেকটা মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে নদীর সাথে সংযুক্ত খালগুলোও ধীরে ধীরে তাদের অস্তিত্ব হারাতে থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসন হাজরাঘাট থেকে বেড়াডোমা পর্যন্ত নদীর কিছু অংশ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও পরে অজ্ঞাত কারণে সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে অন্তত ২৭টি খালের সন্ধান পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে কয়েকটি ওয়ার্ডে কোনো খাল নেই। তবে বাকি ১৪টি ওয়ার্ডে ২৭টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
বেলা’র গবেষণা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র জানান, শহরের এই ২৭টি খালের বিষয়ে তারা অনেক আগেই জেলা প্রশাসনকে বিস্তারিত জানিয়েছেন। নদী, খাল ও জলাশয় উদ্ধারে বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনাও রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের সাবালিয়া খালটি এক সময় বায়তুন নূর জামে মসজিদের পাশ দিয়ে বৈরান নদীতে মিশেছিল। প্রভাবশালী মহল প্রথমে ময়লা ফেলে কৌশলে এটি ভরাট করে। পরে সেখানে সীমানা প্রাচীর দিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। একই কায়দায় অন্যান্য খালগুলোও দখল করা হয়েছে।
শহরের সেন্ট্রাল ড্রেন বা শ্যামাবাবুর খালের অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। ১৯০৫ সালে তৎকালীন পৌর ভাইস চেয়ারম্যান শ্যামাচরণ গুপ্ত স্থানীয় নৌ-যোগাযোগ ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য এই খালটি খনন করেছিলেন। স্বাধীনতার পরেও এই প্রশস্ত খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করত। অথচ নব্বই দশকে ড্রেন নির্মাণের মাধ্যমে এই খালের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটানো হয়। পরে ১৯৯৬ সালে ড্রেনের ওপর মার্কেট নির্মাণ করে খালটির অস্তিত্ব চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাভূমি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এতে ভূমির গঠন ও প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। প্রচুর ধুলোবালির কারণে মানুষের মধ্যে অ্যাজমাসহ বিভিন্ন রোগ বাড়ছে। এটি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
জেলা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার নুর মোহাম্মদ রাজ্য জানান, গইজাবাড়ি খালটি প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই খালটি পুনরায় খনন করা সম্ভব হলে দক্ষিণ টাঙ্গাইলের মানুষ পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবে।
টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক মাহফুজুল আলম মাসুম জানান, নতুন করে যাতে কোনো খাল দখল না হয় সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সরকারের পক্ষ থেকে খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের নির্দেশনা পেলে তারা দ্রুত কাজ শুরু করবেন।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন জানান, তারা এরই মধ্যে গালা খাল, বিন্নাফৈর খাল ও সন্তোষ খাল খননের তালিকা পাঠিয়েছেন। এছাড়া ধলেশ্বরী ও লৌহজং নদী পুনঃখননের জন্য প্রায় ৪৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। খুব দ্রুতই এই কাজগুলো শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।


