২০২২ সালের ২০ নভেম্বর দুপুরে ঢাকার সিএমএম আদালত এলাকায় পুলিশের ওপর পিপার স্প্রে করে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেলকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জঙ্গিরা। এ সময় অপর আসামি আরাফাত ও সবুরকেও ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে তারা। পরে ঘটনাস্থল থেকে আরাফাত ও সবুরকে আটক করা হয়।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কোতোয়ালী থানায় তৎকালীন কোর্ট পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন আকন্দ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় ছিনিয়ে নেওয়া জঙ্গিদের পাশাপাশি আরও ৭ থেকে ৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। ধাপে ধাপে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ২৪ জনকে। ইতোমধ্যে তারা সবাই নিম্ন ও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন। তবে এখনও শেষ হয়নি মামলার তদন্ত, খোলেনি রহস্যের দ্বার।
এরইমধ্যে দফায় দফায় পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ। কয়েক দফা পরিবর্তন করা হয়েছে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। গত ৩০ অক্টোবর এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে এদিন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি পুলিশ)। এজন্য আগামী ৩ ডিসেম্বর এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন আদালত।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে এ মামলায় যে ২৪ জন গ্রেপ্তার হওয়ার পরে জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন, তারা হলেন- শাহ আলম, ফাতিমা তাসনীম শিখা, ঈদি আমিন, হুসনা আক্তার হুসনা, খোদেজা আক্তার লিপি, মো. তানভির সোহেল, তানজিলা আফরোজ, নাসির মিয়া, ওমর ফারুক তালুকদার, মোজাম্মেল হোসেন সাইমন, মো. শেখ আব্দুল্লাহ, মো. রিয়াজুল ইসলাম, ওমর ফারুক নোমান, শাহিন আলম, মো. রশিদুন্নবী ভূইয়া, বখতিয়ার রহমান নাজমুল, বিএম মজিবুর রহমান, মেহেদী হাসান অমি, মো. সুমন হোসেন পাটোয়ারী, তানভীর মিয়া, খায়রুল ইসলাম, মো. আরাফাত রহমান, মো. আ সবুর ও মো. হামিম হোসেন ফাহিম।
এদিকে তদন্তের ধীরগতি সম্পর্কে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিটিটিসি পুলিশের পরিদর্শক মো. আজিজ আহমেদ বলেন, ‘মামলাটি স্পর্শকাতর। তদন্তে সময় প্রয়োজন। দীর্ঘ তদন্তের মধ্যে দিয়ে সত্য বের হয়ে আসবে।’ এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘অনেক সময় তদন্তের স্বার্থে অনেক আসামি গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হয়তো তাদের বিরুদ্ধে কিছু পায়নি, এজন্য জামিন হয়ে গেছে। পরে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হতেও পারে। তখন তারা পলাতক হলে আদালত জামিন বাতিল করতে পারেন।’
স্পর্শকাতর এ মামলার তদন্তে ধীরগতির সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মামলার তদন্তে সময় প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট তথ্য বের করে আনতে সময় নিয়ে তদন্ত করতে হয়। আগেকার আমলে এসব মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোককে হয়রানিও করা হয়েছে।’
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে সাগর ওরফে বড় ভাই ওরফে মেজর জিয়ার (চাকরিচ্যুত মেজর) পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় আয়মান ওরফে মশিউর রহমান (৩৭), সাব্বিরুল হক চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে কনিক (২৪), তানভীর ওরফে সামশেদ মিয়া ওরফে সাইফুল ওরফে তুষার বিশ্বাস (২৬), রিয়াজুল ইসলাম ওরফে রিয়াজ ওরফে সুমন (২৬) ও মো. ওমর ফারুক ওরফে নোমান ওরফে আলী ওরফে সাদ (২৮) পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে।
এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুটি মোটরসাইকেলে আনসার আল ইসলামের অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জন সদস্য অবস্থান নেয়। এছাড়া আদালতের আশপাশে ও মূল ফটকের সামনে অবস্থান করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জন আনসার আল ইসলামের সদস্য। এরপর তারা পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
এরপর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আদালতের মূলফটকের সামনে পৌঁছানো মাত্র আগে থেকেই দুটি মোটরসাইকেল যোগে অজ্ঞাতনামা আনসার আল ইসলামের ৫/৬ জন সদস্য, আদালতের আশপাশে অবস্থানরত আনসার আল ইসলামের আরও ১০/১২ জন সদস্য হামলা করে। তারা কনস্টেবল আজাদের হেফাজতে থাকা আসামি মইনুল হাসান শামিম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান (২৪), মো. আবু সিদ্দিক সোহেল (৩৪), মো. আরাফাত রহমান (২৪) ও মো. আ. সবুর ওরফে রাজু ওরফে সাদ ওরফে সুজনকে (২১) ছিনিয়ে নিতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে। এসময় তারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেলকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার শাহবাবে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কার্যালয়ে দীপনকে দীপনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ছেলে।


