দেশের সবচেয়ে বড় ও মর্যাদাপূর্ণ সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রতি চরম অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র রিসোর্স সেন্টারটিতে ৮৪টি বিভাগের জন্য মোট বই আছে মাত্র ২৩টি।
২০০৭ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ভিজ্যুয়ালি ইমপেয়ার্ড রিসোর্স সেন্টার’ (ভিআইআরসি)। তবে এই কেন্দ্রটি কেবল ১০টি বিভাগের আংশিক পাঠ্যসূচি কভার করতে পারে। কিছু বই এত বড় যে সেগুলিকে একাধিক খণ্ডে ব্রেইল প্রিন্ট করা হয়েছে, যার ফলে ব্রেইল ভলিউমের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯-এ। কিন্তু বইয়ের আসল সংখ্যা ২৩টিই রয়ে গেছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য সাধারণত কমপক্ষে ৪৮টি মূল পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজন হয়। সেখানে কেন্দ্রের এই সংগ্রহটি ভর্তি হওয়া সকল দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তো দূরের কথা, একজন শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ ডিগ্রির জন্যও পর্যাপ্ত নয়।
ভিআইআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে ১৮টি বিভাগে ৩৮ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেছেন। কিন্তু কেন্দ্রের যৎসামান্য সংগ্রহের কারণে শিক্ষার্থীদেরকে নিজেদেরকেই বেশিরভাগ ব্যবস্থা করতে হয়। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তথ্য এখনো হালনাগাদ করা হয়নি, যা প্রশাসনের উদাসীনতার আরও একটি প্রমাণ।
বিভাগীয় সেমিনার লাইব্রেরিগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ ওই ১৮টি বিভাগের মধ্যে ১১টি বিভাগের লাইব্রেরিয়ানের সাথে কথা বলেছে। তারা স্বীকার করেছেন, তাদের কাছে কোনো ব্রেইল শিক্ষামূলক বই নেই।
‘নামেই রিসোর্স সেন্টার’
শিক্ষার্থীরা বলছেন, কেন্দ্রটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এখানে পর্যাপ্ত কর্মীর অভাব, বছরের পর বছর ধরে নতুন বই কেনা হয় না, এবং উপকরণের মানোন্নয়ন বা সম্প্রসারণের কোনো উদ্যোগ নেই। শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা পাঁচটি ল্যাপটপের মধ্যে বেশ কয়েকটির এখনও প্যাকেটই খোলা হয়নি।
সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রবিন খান বলেন, ‘আমাদের সহপাঠীরা লাইব্রেরি থেকে যা খুশি ধার নিতে পারে। কিন্তু আমাদের কোনো বিকল্প নেই। আমরা পিডিএফ লেকচার স্লাইডের ওপর নির্ভর করি, যা পাঠদানের সম্পূর্ণ ধারণা দেয় না। পরীক্ষায় সবার মূল্যায়ন একই মানদণ্ডে করা হয়। কিন্তু যেখানে সুযোগ-সুবিধা সমান নয়, তখন এই মূল্যায়ন কতটা ন্যায্য?’
কেন্দ্রে অপর্যাপ্ত বইয়ের সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন প্রধান প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান। তবে তার যুক্তি, শিক্ষার্থীরা ভিআইআরসি’তে খুব কমই আসে।
লাইব্রেরিয়ান জানেন না!
আশ্চর্যজনকভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ান অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক জানতেনই না যে, ভিআইআরসি’র সংগ্রহে মাত্র ২৩টি বই। এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে জানার পর তিনি স্বীকার করেন সংখ্যাটা কম। তবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এসে আমাদের জানাতে হবে।’
বইয়ের ঘাটতি প্রসঙ্গে জায়গার অভাবকে দায়ী করেন অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কোনো বই কেনা হয়নি। কেন্দ্রটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে এবং একবার সম্প্রসারিত হলে নতুন বই কেনা হবে।


