ঢাবিতে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে সেমিনার

ঢাবিতে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে সেমিনার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্টেট অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইন বাংলাদেশ: পাস্ট হিস্টোরিজ, কনটেম্পোরারি ট্রেন্ডস অ্যান্ড ফিউচার ডিরেকশনস’ শীর্ষক সেমিনার। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার অতীত, বর্তমান প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডেটা, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণার নতুন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সোমবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার ভবনের উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে ‘স্টেট অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইন বাংলাদেশ: পাস্ট হিস্টোরিজ, কনটেম্পোরারি ট্রেন্ডস অ্যান্ড ফিউচার ডিরেকশনস’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেন, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় প্রচলিত গবেষণা পদ্ধতির পাশাপাশি এআই ও নতুন প্রযুক্তির প্রভাব এখন বড় বাস্তবতা। গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি মৌলিকত্ব ও গবেষণা নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় গবেষণার নতুন পদ্ধতি ও মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি বলেন, গত এক যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রে যে পরিবর্তন ঘটেছে, শিক্ষার্থী ও তরুণদের মানসিকতা এবং সামাজিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আরও গভীর গবেষণা প্রয়োজন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমন্বয়ে কাজ করলে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি, গিগ ইকোনমি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেন্টাল হেলথ ও বার্ধক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে আন্তঃবিষয়ক গবেষণা, গবেষণার অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো, তথ্যপ্রাপ্তি এবং গবেষণার ফল নীতিনির্ধারণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, গবেষণায় প্রতিযোগিতাভিত্তিক অর্থায়ন, জাতীয় ডেটা আর্কাইভ, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, গবেষণা নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা এবং তরুণ গবেষকদের ফেলোশিপ ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকে শুধু গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; বরং এর জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক শিকড়, পদ্ধতিগত কাঠামো ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে গভীর আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় পরিমাণগত সূচক ও উপাত্তনির্ভর পদ্ধতির গুরুত্ব বাড়লেও মানুষের জটিল সামাজিক অভিজ্ঞতাকে শুধু গাণিতিক চলকে সীমাবদ্ধ করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ভবিষ্যৎ গবেষণায় পরিমাণগত বিশ্লেষণের পাশাপাশি গুণগত গবেষণার গভীরতা যুক্ত করে পদ্ধতিগত বহুত্ববাদ নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে গবেষণার বড় চ্যালেঞ্জ হলো কেবল বর্ণনামূলক গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্লেষণধর্মী ও সমালোচনামূলক গবেষণা বাড়ানো। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে শুধু জ্ঞানের ভোক্তা নয়, জ্ঞানের উৎপাদক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক প্রক্টর ড. এম আসলাম আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে যৌথ প্রয়োগমূলক গবেষণা বাড়ানো গেলে তা রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় আন্তঃবিষয়ক গবেষণা, দলগত গবেষণা এবং শিক্ষার্থী পর্যায়ে গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণাকে কেবল প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সমস্যা বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, গবেষণায় মেন্টরশিপ, শিক্ষার্থী সম্পৃক্ততা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা উদ্যোগ বাড়াতে হবে। গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।

সেমিনারের শেষ পর্বে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রশ্নোত্তর এবং মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad