ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হল ক্যানটিনের নিম্নমানের খাবার নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ‘রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত’ হলগুলোতে মানসম্মত ও পুষ্টিকর খাবারের নতুন দাবি উঠলেও প্রশাসনের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও খাবারের মানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ঝিনাইদহের একটি সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে ঢাবির বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হন অনিক হাসান। প্রথমবার ঢাকায় এসে হলজীবন শুরু করেছিলেন আশাবাদ নিয়ে। কিন্তু হল ক্যানটিনের প্রথম খাবার তাকে নিরুৎসাহিত করে। শুরুতে নিরুপায় হয়ে খাওয়া চালিয়ে গেলেও কিছুদিন পর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।
প্রথমে ধারণা করা হয় তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু চিকিৎসকের রিপোর্ট জানিয়েছেন, তার অসুস্থতার মূল কারণ ছিল ‘অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের খাবার’।
টাইমস অব বাংলাদেশের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘প্রথম দেড় মাস হলে খেতাম, কিন্তু মেডিকেল রিপোর্ট হাতে আসার পর থেকে আর সেখানে খাই না। এখন বুয়েটে খাই, দাম কিছুটা বেশি হলেও মান অনেকটা ভালো।’
অনিকের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত একই বাস্তবতার মুখোমুখি হন। খাবারে পোকামাকড়, দুর্গন্ধ, কিংবা রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে বাধ্য হয়ে খেতে যান ক্যাম্পাসের বাইরের দোকানগুলোতে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৭০ জন আবাসিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশের অভিযোগ একই। খাবারের মানে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসায় নিজেদের হল ক্যানটিনে খাবার খান না অনেকে। হলগুলোতে বর্তমানে ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা’ না থাকলেও ক্যানটিনগুলোতে ‘লক্ষ্যণীয় কোনো পরিবর্তন’ দেখছেন না শিক্ষার্থীরা।
তবে মুদ্রার ওপিঠে রয়েছে কিছুটা ভিন্ন দৃশ্য। যেসব হলের খাবারের দাম কিছুটা বেশি সেসব ছাত্রহলগুলোর খাবারের মান তুলনামূলক ভালো।
বঙ্গবন্ধু হলের আবাসিক শিক্ষার্থী নাজিমুস সাকিব বলেন, ‘আমাদের নতুন ক্যানটিনে খাবারের দাম কিছুটা বেশি হলেও খাবারের পরিবেশ, স্বাধ বিবেচনায় ঠিক এই আছে।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের পর প্রশাসন একাধিক পদক্ষেপ নেয়। প্রতিটি হলে গঠন করা হয় ‘ফুড মনিটরিং টিম’। এসব টিমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব এবং হাউস টিউটরদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ঢাবি প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রধান নির্বাহী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ‘অনেক হলে ক্যানটিন ফি দুই হাজার টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে, কিছু হলে সম্পূর্ণ মওকুফও দেওয়া হয়েছে, যেন মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।’
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত খাবারে পোকামাকড় কিংবা অপ্রত্যাশিত বস্তু পাওয়া যায়। সম্প্রতি সূর্য সেন হলে খাসির তরকারিতে কাঁকড়া-পোকা পাওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মনিটরিং টিম এখন সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার পরিদর্শন করছে, বিষয়টি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্খিত। ক্যানটিন মালিককে সতর্ক করা হয়েছে এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’
ছাত্রী হলগুলোর অবস্থাও আলাদা নয়। শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাইফা ইসলাম বলেন, ‘রান্নাঘর অত্যন্ত নোংরা, খাবারের গুণগত মান ও পুষ্টিগুণ দুটোই কম। অভিযোগ করেও কোনো পরিবর্তন পাইনি, বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।’
এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক নাসরিন সুলতানার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ক্যানটিনের খাবারে প্রাণনাশী ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাইসহ ১৪ ধরনের ক্ষতিকর জীবাণু শনাক্ত হয়।
গবেষণাটি পরিচালনা করেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক প্রগতি বকশী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জুক্তা আহসান ও পুষ্টি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শারমিন রুমি আলিম।
তবে, গবেষণা প্রকাশের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সাম্প্রতিক ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রায় সব প্রার্থীর ইশতেহারে খাবারের মানোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ছিল। ফলে হল সংসদের নির্বাচিতরাও গুরুত্বারোপ করছে খাবারের মানের দিকে।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) আহসান হাবিব ইমরোজ জানান রান্নার কাঁচা বাজার ক্রয়ের পর সেগুলো প্রত্যেকদিন ছবি তুলে হল সংসদের গ্রুপে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ক্যানটিন মালিকদের।
তিনি বলেন, ‘খাবারের ছবি তুলে দিলে শিক্ষার্থীরা দেখতে পারবেন তারা কী খাচ্ছে, খাবার কতটা নিরাপদ।’
অপরদিকে জগন্নাথ হল সংসদ পরিকল্পনা করছে খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে নিজেদের ফুড মনিটরিং টিম গঠন করার। তবে শিক্ষার্থীরা এখনো সন্দিহান।
বিজয় একাত্তর হলের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান বলেন, ‘জুলাই এর পর থেকে অনেকগুলো মিটিং করা হয়েছে, বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিন্তু খাবারের মান অত একটা পরিবর্তন হয়নি।’
তাদের মতে, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল এই সংকটের মূল কারণ। প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি হলে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ‘বাকি’ জমিয়ে কেন্টিন মালিকদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করত আর যার ভুক্তভুগী হতেন শিক্ষার্থীরা।
তবে সম্প্রতি সময়ে কোনো একক রাজনৈতিক দলের প্রভাব না থাকলেও আশানুরূপ ফলাফল আসছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের শিক্ষার্থী মুসাদ্দিকুর রহমান রিয়াদ বলেন, ‘জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর কিছুটা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে বড় কোনো উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে না।’
শিক্ষার্থীদের খাবারের জন্য দুটি ব্যবস্থা রয়েছে ডাইনিং (মেস) ও ক্যানটিন। শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ডাইনিংয়ে খাবারের দাম তুলনামূলক কম ও মান ভালো। অন্যদিকে ইজারাভিত্তিক ক্যানটিনে দাম অনেকটা বেশি হলেও মান নিম্নমানের।
খাবারের মান ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দিষ্ট নীতি বা ভর্তুকি নেই। শিক্ষার্থীদের মতে, প্রশাসনিক ভর্তুকি ও তদারকি বাড়ালে খাবারের মান ও পরিবেশ উভয়ই উন্নত হবে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ বলেন, ‘ওরা নানা কাজে এত টাকা খরচ করে, কিন্তু যদি একটু ভর্তুকির ব্যবস্থা করে তাহলে খাবারের মান অনেকটা ভালো হতো। ক্যানটিনগুলোতে ভর্তুকি দিতে আসলে সমস্যা কোথায়?’


