বর্তমানে ঢাকায় যেকোনো সমস্যা বা ক্ষোভ প্রকাশের একটিই চেনা সমাধান দাঁড়িয়েছে—রাস্তা অবরোধ। কোনো প্রাণহানি হোক, অবিচার হোক কিংবা কোনো দাবি পূরণ না হোক—মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে শহরের কোনো ব্যস্ত মোড় দখল করে পুরো রাজধানীকে অচল করে দেওয়া। এই প্রতিবাদের ফলে দাবি আদায় হবে কি না, তা পরের কথা; তবে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যে অনিবার্য, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ঢাকাবাসীর কাছে এই যানজট এখন এক নিয়মিত শাস্তির নাম। এটি নতুন কিছু নয়, আবার কোনো নির্দিষ্ট সরকারের আমলের সমস্যাও নয়। গত তিন দশক ধরে—নির্বাচিত বা অনির্বাচিত, রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক—যে আমলই হোক না কেন, রাস্তা অবরোধই হয়ে উঠেছে ঢাকার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশৃঙ্খলা এখানে এক ভয়ংকর নিয়মে পরিণত হয়েছে।
তিন কোটিরও বেশি মানুষের এই ঢাকা এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম যানজটপূর্ণ শহর। সরু রাস্তা, হরেক রকমের ধীরগতির যানবাহন আর ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করায় সাধারণ দিনগুলোতেই এখানে গাড়ি চলে ঢিমেতালে। ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাব, শাহবাগ বা মহাখালীর মতো মোড়গুলো সব সময় চাপে থাকে। এমন এক ভঙ্গুর ব্যবস্থায় সামান্য অবরোধও পুরো শহরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থবির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
তা সত্ত্বেও রাস্তা অবরোধই এখন প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার। গত বুধবারের ছাত্র বিক্ষোভ আবারও সেই চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছে। হলের ভেতর সংঘর্ষে আহত এক সহপাঠীর মৃত্যুর বিচার চেয়ে ফার্মগেটে রাস্তা আটকে দেয় তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে সায়েন্স ল্যাব এলাকা অচল করে দেয় ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। টেকনিক্যাল মোড় থেকে শুরু করে পুরান ঢাকা—সবই ছিল স্থবির।
টানা দুই দিন এই অবরোধ চলায় অফিসগামী মানুষ আটকা পড়লেন, মুমূর্ষু রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলেন না। নারী, শিশু আর প্রতিবন্ধী মানুষরা থমকে থাকা গাড়িতে জিম্মি হয়ে রইলেন। জীবন রক্ষাকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। নষ্ট হলো প্রচুর জ্বালানি আর মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—সময়।
প্রতিবাদকারীদের দাবি হয়তো ন্যায্য, তাদের ক্ষোভও অমূলক নয়। কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের এই পদ্ধতির কারণে এর সাজা ভোগ করতে হলো সাধারণ মানুষকে, নীতিনির্ধারকদের নয়। রাস্তা অবরোধ ক্ষমতাবানদের ওপর ততটা চাপ তৈরি করে না, যতটা সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলে। মনোযোগ পাওয়ার জন্য সাধারণ মানুষকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করার এই সংস্কৃতি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
এই অবস্থা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারই প্রমাণ। ঢাকায় এখন নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার জায়গা দখল করেছে রাজপথ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিযোগ শোনার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেই, মন্ত্রণালয়গুলো সাধারণ মানুষের থেকে যোজন যোজন দূরে, আর আইনি ব্যবস্থা অত্যন্ত ধীর ও অস্বচ্ছ। আলোচনার পথগুলো যখন বন্ধ থাকে, তখনই মানুষ রাস্তা বেছে নেয়। কারণ রাজপথ অচল করলে সহজেই সবার নজরে আসা যায়।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনভোগান্তি তৈরি করা মানেই কাউকে যৌক্তিক পথে আনা নয়। বারবার শহর অচল করলে প্রতিবাদের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা কমে যায় এবং আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়। যখন প্রতিটি দাবির জন্যই শহরকে জিম্মি করতে হয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক অধিকার থাকে না, বরং এক ধরনের ‘গণশাস্তি’ হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকার নগর পরিকল্পনা এই সংকটকে আরও চরমে নিয়ে গেছে। এখানে হেঁটে চলার মতো ফুটপাত নেই, সাইকেল চালানোর পথ নেই, আর গণপরিবহনও অত্যন্ত নাজুক। ফলে রাস্তা বন্ধ হলে মানুষের বিকল্প কোনো পথ থাকে না; পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই শহরের কোনো আপদকালীন সহনক্ষমতা নেই।
আমরা এখন এক দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছি। বিক্ষোভ থেকে যানজট তৈরি হয়, আর দীর্ঘস্থায়ী যানজট থেকে জন্ম নেয় মানুষের ক্ষোভ ও ক্লান্তি। সেই ক্ষোভ থেকে আবার তৈরি হয় নতুন অস্থিরতা। ফলে শহরটি স্থায়ী এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।
বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরে প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বা রুট থাকে, যেখানে জনজীবন সচল রেখেই দাবি জানানো যায়। কিন্তু ঢাকায় তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থাপনা নেই। যেকোনো গোষ্ঠী এখানে বিনা বাধায় রাস্তা দখল করে জনজীবন বিপন্ন করতে পারে।
এই সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশকের হরতাল আর অবরোধ সাধারণ মানুষকে এই পাঠ দিয়েছে যে—প্রতিষ্ঠান বা আইনের চেয়ে রাজপথই দ্রুত ফল দেয়। বিগত সরকারগুলো এই সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়ে পরোক্ষভাবে এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করেছে যে, বিশৃঙ্খলা করলেই দাবি আদায় হয়।
শুধু মেট্রোরেল বা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। অবকাঠামো যত আধুনিকই হোক না কেন, যদি প্রধান মোড়গুলো বারবার দখল হয়, তবে কোনো যাতায়াত ব্যবস্থাই সচল রাখা সম্ভব নয়। একটি শহরের সচল থাকা শুধু কংক্রিটের ওপর নির্ভর করে না, তা নির্ভর করে শৃঙ্খলা ও আইনের সঠিক প্রয়োগের ওপর।
পরিশেষে এটি ভারসাম্যের প্রশ্ন। প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন আছে, তেমনি মানুষের চলাফেরা করা, কাজ করা বা চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও অনস্বীকার্য। যখন প্রতিবাদের নামে রাস্তা দখল করা হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ঢাকা এভাবে আর চলতে পারে না। একটি মেগাসিটি এভাবে খামখেয়ালিপনা আর বাধার মুখে চলতে পারে না। প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম, বিকল্প স্থান এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, আমরা সেই চক্রেই বন্দি থাকব যেখানে সমস্যার সমাধান মানেই রাস্তা অবরোধ, আর তার চরম মূল্য দেবে সাধারণ জনগণ।
লেখক: স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স এডিটর, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ।


