ঢাকায় ১২ হাজার পারিবারিক মামলার স্তূপ, বিচ্ছেদের বলি শিশুরা

ঢাকায় ১২ হাজার পারিবারিক মামলার স্তূপ, বিচ্ছেদের বলি শিশুরা
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি।
Advertisement
Advertisement

২০১৯ সালে ১ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে হয় সুমাইয়া রহমান (ছদ্মনাম) ও মামুন মিয়ার। এক বছরের মধ্যে জন্ম হয় সন্তানের। কিন্তু সংসারে খটমট লেগেই আছে। এর মধ্যেই বিচ্ছেদ। তালাক হওয়ার পর দেনমোহর ও খোরপোশ দাবি করে মামলা করেন সুমাইয়া। ঢাকার পারিবারিক আদালতে সেটি নিষ্পত্তি হয়নি এত বছরেও।

তিন বছর আগে মেয়েটি আবার বিয়ে করেছেন। কিন্তু তার শিশু কন্যা বাবার স্নেহ ও মায়ের কোল থেকে বঞ্চিত। নতুন সংসারে জায়গা হয়নি মেয়েটির, সে আছে নানির কাছে। বাবা নিয়ে যেতে চাইলেও তাকে দিচ্ছেন না তিনি।

মামুনও চান মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হোক, মেয়েটিকে তিনি যেকোনো মূল্যে নিজের কাছে চান। আদালতের আদেশ ছাড়া সেটি সম্ভব নয়।

১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবসকে সামনে রেখে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, ঢাকার পারিবারিক আদালত এমন সব হাজারো মামলার নথিতে ঠাসা। মামলার স্তূপ বাড়তে থাকার পর আদালত বাড়িয়েও চাপ সামাল দেওয়া যায়নি।

বর্তমানে পারিবারিক আদালত রয়েছে মোট ১৪টি, গত বছর সংখ্যাটি ছিল কেবল তিনটি।

এসব আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদ ছাড়াও দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর; ভরণপোষণ এবং শিশু সন্তানদের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান সম্পর্কিত মামলা হয়।

গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার।

পারিবারিক আদালত সংশ্লিষ্টরা বলেন, আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আপস-মীমাংসার চেষ্টা করা। যদি সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় তবে আদালত তার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে করতে কোনো কোনো মামলায় লেগে যায় চার থেকে পাঁচ বছর, যে কারণে সুরাইয়া-মামুনের মেয়েটি এখনো বাবার কাছে যাবে কি না, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী আইনজীবী সামসুদ্দোহা সুমন। তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেমন আদালত সংখ্যা বাড়ানো, ই-পারিবারিক আদালত চালু, ইত্যাদি।’

তবে অনেক সময় বিচারক থাকেন না, বিবাদী পক্ষও সময়ের আবেদন করেন; যার ফলে বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন, বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

হিউম্যান রাইটস মনিটরিং অরগানাইজেশনের চেয়ারপারসন মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘আগে পারিবারিক আদালতে এত চাপ ছিল না।’

পারিবারিক মামলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মামলা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেনমোহর দাবিতে। উচ্চ মধ্যবিত্তরা অনেক সময় ক্ষমতার ব্যবহারে মামলা করছে।

‘তাদের কাছে টাকা গুরুত্বপূর্ণ না। তাদের লক্ষ্য শায়েস্তা করা শাস্তি দেওয়া’, বলেন তিনি।

ভুগছে সন্তান

২০২১ সালে সুমাইয়া ও মামুন যখন বিচ্ছেদ হয়, তখন তাদের মেয়ের বয়স কেবল সাত দিন। দুই বছর পর তার মা ফের বিয়ে করেন। তখন থেকে সে বড় হচ্ছে বৃদ্ধা নানির কাছে।

৮ বছর বয়সী নাফিয়া ও ৬ বছর বয়সী আরুশাও বাবা-মাকে একসঙ্গে পাচ্ছে না।

২০১৬ সালে পারিবারিক ভাবে তাদের মা রোকাইয়া শারমিন ও বাবা নাসিম আহমেদের বিয়ে হয়। ২০১৮ সালে নাফিয়া ও ২০২০ সালে জন্ম নেয় আরুশা। এর তিন বছর পর ২০২৩ সালে বাবা মায়ের বিচ্ছেদ।

বিচ্ছেদের পর মেয়ে দুজন বাবার কাছেই ছিল। তবে তিনি আবার বিয়ে করার পর নিয়ে আসেন মা।

মানবাধিকার কর্মী ও ‘আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’-এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক টাইমসকে বলেন, ‘যদি কোনো পরিবারে বিচ্ছেদও হয় তাহলে সেটা সিস্টেমে হতে হবে। সন্তানদের জন্য সুন্দর পরিবেশ করে তাদের চিন্তা আগে করতে হবে।’

বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘স্বামী স্ত্রীর কলহের এই পরিবেশটা শিশুর জন্যও ক্ষতিকর। বাচ্চার ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। অনেকে সব কিছু ভুলে বাচ্চার দিকে তাকিয়ে সব কিছু মানিয়ে নেয়। তবে বিচ্ছেদের আগে উভয় পক্ষকেই সন্তান নিয়ে ভাবা উচিত বিশেষভাবে।’

‘উন্নত সমাজ ব্যবস্থায় স্বামী ও স্ত্রীর কাউন্সিলের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এটা নেই। আমাদের সমাজে আগে যৌথ পরিবারগুলো এই ভূমিকা পালন করত। এখন তাও নেই’, বলেন তিনি।

‘প্রয়োজন শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফারহানা জামান বলেন, ‘পরিবার বা সংসার টিকিয়ে রাখতে সবাইকে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ বৃদ্ধি করতে হবে।’

‘বর্তমান যুগে সবাই খুব স্বাধীনচেতা। সবাই নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে পছন্দ করে। ফলে মানুষের মধ্যে ছাড় দেয়ার মনমানসিকতা কমে গেছে৷ এ ছাড়া, পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পাচ্ছে।’

বিচ্ছেদের বিষয়ে সমাজে আগে যে নেতিবাচক মনোভাব ছিল, সেটি এখন কমেছে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

‘বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি’র সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বর্তমান উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, ‘বর্তমান সময়ে কেউ কাউকে সম্মান করতে চায় না, এটা ঠিক না। আত্নীয়তার সম্পর্কও এখন হালকা হয়ে গেছে। পরিবারে সময় দিতে হবে।’

হিউম্যান রাইটস মনিটরিং অরগানাইজেশনের চেয়ারপারসন মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী কেউ কাউকে সময় দিচ্ছে না। ফলে দূরত্ব তৈরি করছে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad