আগামী আট বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার সরকারি স্বপ্নের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৫০১ বিলিয়ন ডলার। একে আগামী আট বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতে হলে বাংলাদেশকে টানা প্রতিবছর গড়ে ৯ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সবশেষ প্রান্তিকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশে। অর্থাৎ, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রবৃদ্ধির এই গতিকে চার গুণেরও বেশি বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন লক্ষ্য পূরণ করতে হলে অলৌকিকভাবে দেশের জ্বালানি সংকটের সমাধান হতে হবে, একলাফে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ আসতে হবে, আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে এবং শিক্ষা ও অবকাঠামো খাতে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটাতে হবে।
অথচ অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বেশ উদ্বেগজনক। সরকার যেখানে এক কোটি নতুন আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলছে, সেখানে শিল্প পুলিশের হিসাব অনুযায়ী গত দুই বছরেই বন্ধ হয়ে গেছে ৪৫৭টি কারখানা। এর মধ্যে ১৭০টি ছিল পোশাক ও বস্ত্র খাতের কারখানা, যার ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন লাখো শ্রমিক।
বৈদেশিক বিনিয়োগের গতিও বেশ মন্থর। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা আফ্রিকার উদীয়মান দেশ উগান্ডার পাওয়া বিনিয়োগের অর্ধেকেরও কম। দেশীয় বিনিয়োগের অবস্থাও একইভাবে নাজুক।
চলতি অর্থবছরে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তা মানতে পারছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, বিশ্বব্যাংক ৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবির) ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই বড় তফাতই এখন প্রধান চিন্তার বিষয়।
অতীতে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত টানা চার বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের উপরে ছিল, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশে পৌঁছে যায়।
কিন্তু সেই সময়ের সঙ্গে আজকের দিনের আকাশ-পাতাল তফাত। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা, চড়া মূল্যস্ফীতি, থমকে থাকা বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের বেহাল দশা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বর্তমানের এই চ্যালেঞ্জকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছে।
‘অত্যন্ত কঠিন এক পথ’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, একটি দেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো বিনিয়োগ আর জ্বালানি নিরাপত্তা। কিন্তু বর্তমানে পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে বহু শিল্পকারখানা তাদের পুরো ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না।
বাংলাদেশ এখনো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল। তবে জ্বালানি আমদানিনির্ভর অন্য অনেক দেশ কিন্তু ঠিকই উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কারণ তারা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ভালো শাসনব্যবস্থা এবং পরিবেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে সামলাতে পেরেছে।
অধ্যাপক শাহাদাত সিদ্দিকীর মতে, বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহ, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামের চড়াই-ওতরাই বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি। এগুলো সরাসরি দেশের উৎপাদন খরচ ও ব্যবসার সক্ষমতায় আঘাত হানছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে যদি এগোতে হয়, তবে বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায়, ব্যাংক ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সংস্কার একই সঙ্গে চালাতে হবে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২৯ শতাংশ। একে অন্তত ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশে তুলতে হবে। সরকারি বিনিয়োগ বর্তমানের ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা দরকার, আর বেসরকারি বিনিয়োগকে একলাফে বাড়িয়ে জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে।
এর পাশাপাশি তিনি দ্রুত লজিস্টিক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগকারীদের জন্য এক ছাদের নিচে সব সেবা (সিংগেল উইন্ডো) নিশ্চিত করা, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এবং বন্দরের কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দ্রুত পণ্য খালাসের ওপর জোর দেন।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, ব্যাংক খাতে ঋণের সুদের হার বা মূলধনের খরচ বেশি হওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা বা কারখানা চালুর সাহস পাচ্ছেন না। তাই অর্থায়নের খরচ কমাতে এবং আর্থিক খাতকে সামলে নিতে ব্যাংকগুলোকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতাও আরেকটি বড় বাধা। বাংলাদেশে কর-জিডিপির অনুপাত মাত্র ৮ শতাংশের মতো। এটি অন্তত ১৩ থেকে ১৪ শতাংশে তোলা উচিত বলে অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরে তাগিদ দিয়ে এলেও বাস্তবে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসার বিষয়টি নতুন ভাবনার জন্ম দিয়েছে।
এই উত্তরণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি বাড়ালেও বেশ কিছু অর্থনৈতিক ধাক্কা দেবে। কারণ এর ফলে বাংলাদেশ অনেক ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা ও অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারাবে।
অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য, বাংলাদেশকে এখন আর অন্য দেশের দয়ার বা বাণিজ্যের বিশেষ সুবিধার ওপর ভরসা করে থাকলে চলবে না। বরং নিজের উৎপাদন ক্ষমতা, দক্ষতা ও প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়ে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হবে। এজন্য দরকার দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, শ্রম আইনের সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
চলতি বছরের শেষের দিকে এই উত্তরণ ঘটার কথা থাকলেও সরকার এতে আরও তিন বছর সময় বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব প্রাতিষ্ঠানিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে হলে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য ছুঁতে হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নীতিগত স্থায়িত্বকে সবার আগে রাখতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। আগামী কয়েক বছরে এটি অন্তত ১ থেকে দেড় শতাংশে না পৌঁছালে অর্থনীতিতে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে না।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের সভাপতি হুমায়ুন রশিদ মনে করেন, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য ও আকর্ষণীয় বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরতে জোরদার ব্র্যান্ডিং প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে সুশাসনের ওপর। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক খাতে সত্যিকারের সংস্কার আনা জরুরি। এসব গোড়ায় গলদ রেখে কেবল বড় বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করলে কোনো ফল আসবে না।
ব্যাংক খাতের চড়া সুদ ও শর্তের কারণেও নতুন শিল্পে বিনিয়োগ আসছে না। দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো পুরোপুরি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে থাকেন। কিন্তু ক্যাপিটাল মার্কেট, বন্ড মার্কেট বা ইকুইটি মার্কেট গড়ে না ওঠায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অন্যান্য পথ বন্ধ হয়ে আছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাশরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশকে প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন খাতের পথ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, এতদিন বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করেই এসেছে। কিন্তু এখন অন্যান্য রপ্তানি খাতকেও এগিয়ে নিতে হবে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এই নতুন খাতগুলো থেকে যদি কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তি আয় আসে, তবেই প্রবৃদ্ধির গতি বাড়বে।
কর্মসংস্থান নিয়েও রয়েছে গভীর উদ্বেগ। প্রতিবছর নতুন করে শ্রম বাজারে আসছে ২২ থেকে ২৩ লাখ তরুণ। তাদের জন্য দেশ-বিদেশে ভালো আয়ের কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারলে বাংলাদেশ তার তরুণ জনমিতির সুবিধা কাজে লাগাতে পারবে না।
মাশরুর রিয়াজের মতে, নতুন যুগের শিল্পকারখানার চাহিদা বোঝে–এমন দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কী আছে?
সরকারের নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অবশ্য এই মূল বিষয়গুলোর অনেক কিছুই উঠে এসেছে।
পরিকল্পনার প্রথম ধাপে জোর দেওয়া হয়েছে মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সামাজিক সুরক্ষার হাতকে আরও চওড়া করার ওপর।
পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা করা, ব্যাংক ও লজিস্টিক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানো এবং সহজে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করার বিষয়টিও রাখা হয়েছে।
উৎপাদন খাত বাড়ানো, উচ্চ মানযুক্ত শিল্পের বিকাশ, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বাংলাদেশকে যুক্ত করা এবং বেশি করে দেশী-বিদেশি বিনিয়োগ আনার মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের একই কথা–পরিকল্পনা যতই ভালো হোক, মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর বাস্তবায়ন। বাংলাদেশ আগেও অনেক বড় বড় পরিকল্পনা করেছে, কিন্তু জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা, ঋণের উচ্চ সুদ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিনিয়োগ পরিবেশের অনিশ্চয়তা দূর করার ক্ষেত্রে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
অবশ্য এসবের মাঝেও একটি সম্ভাবনা দেখছেন অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ হতে পারে। চীন, ভারত বা পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের ওপর শুল্কের হার তুলনামূলক কম। তাই বাংলাদেশ যদি প্রযুক্তি ও উৎপাদনের দক্ষতা বাড়াতে পারে, তবে আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।


