যে সিনেমার মাধ্যমে ১৯ বছর বড় পর্দার কাজে যুক্ত হয়েছিলেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অপি করিম, সেই ‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমাটি এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার আলোচিত ও আন্তর্জাতিক সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ানো সিনেমাটি চরকিতে মুক্তি পাচ্ছে বুধবার রাত ১২টায়। ’মায়ার জঞ্জাল’ ছিল অভিনেত্রী অপি করিমের দ্বিতীয় সিনেমা এবং যৌথ–প্রযোজনার প্রথম কাজ।
সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন পশ্চিম বঙ্গের প্রশংসিত নির্মাতা ’ফড়িং’, ‘একটি বাঙালি ভূতের গপ্পো’, ’ভালোবাসার শহর’ খ্যাত ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী এবং এর প্রযোজক বাংলাদেশের জসীম আহমেদ। কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি ছোটগল্প ‘বিষাক্ত প্রেম’ ও ‘সুবালা’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি।
প্রায় দুই দশক পর সিনেমায় যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে অভিনেত্রী অপি করিম বলেছিলেন, ‘প্রথমে লেখাপড়া এবং পরে কাজের চাপের কারণে সিনেমায় নিয়মিত হতে পারিনি। কিন্তু এই সিনেমাটি (মায়ার জঞ্জাল) করেছিলাম নির্মাতা ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর কারণে। তার ’ফড়িং’, ’ভালোবাসার শহর’ দেখে অনেক ভালো লেগেছিল। বিশেষ করে ’ভালোবাসার শহর’–এ জয়া আপু (জয়া আহসান) অভিনয় এত ভালো লেগেছিল যে, আমারও একটু কাজ করার আগ্রহ হয়েছিল। সেই আগ্রহ থেকেই কাজটি করা। এর সঙ্গে আরও আগ্রহ বাড়িয়েছে অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। আর গল্প এবং চরিত্রগুলোও খুব ন্যাচারাল।’
সিনেমায় অপি করিমের চরিত্রের নাম সোমা। তার স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কলকাতার জনপ্রিয় অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তী। তার চরিত্রের নাম চন্দন বা চাঁদু। অন্য চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন ঢাকার সোহেল মণ্ডল, কলকাতার পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, চান্দ্রেয়ী ঘোষ, শাওলি চট্টোপাধ্যায়। সিনেমায় সমান্তরাল দুটি গল্পে দেখা যায়—সমাজ থেকে ছিটকে পড়া দুজন মানুষ সোমা ও চাঁদ কীভাবে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝে টিকে থাকার পথ খোঁজে। আবেগ, বাস্তবতা ও জীবনের নির্মম রূপ তুলে ধরার ক্ষেত্রে সিনেমাটি অনন্য।
নিজের চরিত্র ‘চাঁদু’ নিয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘আমাদের রোজকার যে সিনেমা সেখানে চাঁদুকে বা চরিত্রটাকে পাওয়া যাবে না। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে চাঁদুর মতো চরিত্রদের সঙ্গে যে প্রতিনিয়ত দেখা হয়, তেমনটাও না। কিন্তু মায়ার জঞ্জাল সিনেমায় এই চরিত্রটাকে মন দিয়ে দেখা হয়েছে। চরিত্রটি যে সমাজের বা শেণির, সেখানে তার সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানসিক কী কী সমস্যা তৈরি হয়, সেটা খুব বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।’
নির্মাতা জানান, নগরজীবনের কঠিন বাস্তবতার পটভূমিতে নির্মিত ‘মায়ার জঞ্জাল’ দারিদ্র্য, বেকারত্ব, ভঙ্গুর সম্পর্ক ও নৈতিক আপসের সঙ্গে লড়াই করা কয়েকজন মানুষের গল্প। তাদের জীবন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা, হতাশা ও টিকে থাকার সংগ্রাম তাদের কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি করে, উন্মোচন করে দৈনন্দিন জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আবেগ ও সামাজিক জটিলতা।
সিনেমার প্রযোজক জসীম আহমেদ এবং নির্মাতা ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী দীর্ঘদিনের পরিচিত বা বন্ধু। সিনেমাকে ভালোবেসেই তাদের এগিয়ে যাওয়া। বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার বাসনা থেকে যে কাজ শুরু করেছিলেন, সেটা তারা কিছুটা হলেও করতে পেরেছিলেন ‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমা দিয়ে।
‘মায়ার জঞ্জাল’ ২০২০ সালে সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্ব প্রিমিয়ার করে এবং এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড বিভাগে মনোনয়ন পায়। একই বছর মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত হয়, যেখানে এর ইউরোপীয় প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। পরে ইতালির ২১তম এশিয়াটিকা চলচ্চিত্র উৎসবে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে জুরি পুরস্কার এবং কলকাতার আর্টহাউস এশিয়া চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা দক্ষিণ এশীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পুরস্কার অর্জন করে ছবিটি। ২০২২ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান ফিল্ম কম্পিটিশন বিভাগে অংশ নিয়ে ‘মায়ার জঞ্জাল’ সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পায়।
এরপর ২০২৪ সালের ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস বাংলা-তে বড় সাফল্য পায় ‘মায়ার জঞ্জাল’। মোট ৭টি বিভাগে পুরস্কার জেতে ছবিটি। এর মধ্যে ছিল সমালোচকদের বিচারে সেরা চলচ্চিত্র, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা সম্পাদনা, সেরা শব্দ পরিকল্পনা, সেরা চিত্রগ্রহণ, সেরা পোশাক পরিকল্পনা এবং সেরা নবাগত অভিনেতার পুরস্কার।
সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পান ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী ও সুগত সিনহা। সেরা সম্পাদনায় সুমিত ঘোষ, সেরা শব্দ পরিকল্পনায় শুভদীপ সেনগুপ্ত, সেরা চিত্রগ্রহণে ইন্দ্রনীল মুখার্জি এবং সেরা পোশাক পরিকল্পনায় ঋতারূপা ভট্টাচার্য পুরস্কৃত হন। সেরা নবাগত অভিনেতার পুরস্কার পান সোহেল মণ্ডল। একই আসরে সমালোচকদের বিচারে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পায় ‘মায়ার জঞ্জাল’।
দুই বাংলার প্রেক্ষাগৃহে ‘মায়ার জঞ্জাল’ মুক্তি পায় ২০২৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। সেসময় অভিনেত্রী অপি করিমের বড় পর্দায় প্রত্যাবর্তন এবং ঋত্বিক চক্রবর্তীর সঙ্গে তার জুটি সিনেমাটি নিয়ে দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করেছিল।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর অভিনয়ের মুন্সিয়ানা ও নির্মাণশৈলীর জন্য এটি দুই বাংলাতেই দারুণ প্রশংসিত ও আলোচিত হয়। প্রেক্ষাগৃহে দেখার সুযোগ যারা পাননি কিংবা আবারও যারা সিনেমাটি দেখতে চান, তারা যে দেশেই থাকুন না কেন, বুধবার রাত ১২টা থেকে চরকিতে উপভোগ করতে পারবেন ‘মায়ার জঞ্জাল’।


