মাসের পর মাস একে অন্যকে অপমান করে এবার হোয়াইট হাউসে অপ্রত্যাশিতভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। স্থানীয় সময় শুক্রবার ওভাল অফিসের বৈঠকে তারা হাসিমুখে একে অপরের প্রশংসা করেন এবং নিউইয়র্কের জন্য একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, রাজনৈতিকভাবে বিপরীতমুখী ও একে অপরের প্রতি আক্রমণাত্মক দুই ব্যক্তির প্রথম সাক্ষাতেই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ সবাইকে বেশ অবাক করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রিপাবলিকান শিবিরের ধনকুবের আর মামদানি এক তরুণ ডেমোক্রেটিক নেতা। তাদের মধ্যে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি, অর্থনৈতিক নীতি, ইসরায়েল প্রীতি ও ফিলিস্তিন বিরোধীতাসহ দেশের সবচেয়ে ধনী শহর নিউইয়র্কের নানা খাত নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল।
এমনকি মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর শহরটির জন্য বরাদ্দকৃত ফেডারেল অর্থও বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। মামদানিও তখন ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। তবে প্রথম সাক্ষাতেই দুজনের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ৩৪ বছর বয়সী মামদানি ট্রাম্পের ডেস্কের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রেসিডেন্ট তাকে উষ্ণভাবে হাত চাপড়ে দেন। এসময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা অনেক বিষয়ে একমত, এটা আমি আগে ভাবিনি। সবচেয়ে বড় মিল: আমরা দুজনই চাই আমাদের এই প্রিয় শহরটি (নিউইয়র্ক) খুব ভালো থাকুক।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, মামদানির সঙ্গে তার বৈঠক প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি আন্তরিক ছিল।

অন্যদিকে নবনির্বাচিত মেয়র বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টের যে বিষয়টি সবচেয়ে মূল্যবান মনে করছি, তা হলো- আমাদের ব্যক্তিগত মতবিরোধের বিষয়গুলো তিনি এড়িয়ে গেছেন এবং নিউইয়র্কবাসীর সেবায় আমাদের যে অভিন্ন লক্ষ্য, সেটাই তার কাছে গুরুত্ব পেয়েছে।’
মেয়র হিসেবে মামদানি নিউইয়র্কে আরও আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা ট্রাম্পকে জানালে তাকে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখা যায়। এমনকি ট্রাম্পের সমর্থকরাও তাকে ভোট দিয়েছেন-এমন খবরও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আনন্দিত করেছে।
মামদানি বলেন, ‘যেসব ভোটার ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকেই আমরা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সমস্যার কথা শুনেছি। তারাই নিউইয়র্কে বাস ভাড়া নিয়ে অভিযোগ করেছেন। নিউইয়র্ক অভিবাসীর শহর। সবচেয়ে ধনী শহর এবং ব্যয়বহুল শহর।’
‘তবুও এখানে বেশিরভাগ নাগরিক মাস শেষে গণপরিবহনের ভাড়া পরিশোধের মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেননি। এটি দুঃখজনক। আমরা এ মানুষগুলোর জীবনমান আরও উন্নত করতে চাই। তারাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত নিউইয়র্ক গড়ে তোলার কারিগর’, যোগ করেন মামদানি।
ট্রাম্পও এ পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়ে বলেন, ‘তার (মামদানি) কিছু ধারণা আমার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি যদি ভালো করেন, নিউইয়র্ককে ভালো রাখেন তাহলে আমি খুশিই হব।’
সাংবাদিকরা এদিন মামদানিকে বারবার আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করলে ট্রাম্পই তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে এর চেয়েও খারাপ বলা হয়েছে। তাই এটা নিয়ে আমার সমস্যা নেই। মামদানি কাজ শুরু করলে আমার সম্পর্কে মত বদলে নেবে বলেই আমার ধারণা।’

মামদানি এখনও ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট মনে করেন কি না এমন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ট্রাম্পই মজা করে বলেন, ‘ঠিক আছে, আপনি “হ্যাঁ” বললেই সহজ হয়।’
শেষদিকে একজন সাংবাদিক ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন, মামদানি মেয়র হলে তিনি কি নিউ ইয়র্কে ফিরে আসার কথা ভাববেন? ট্রাম্প হেসে জবাব দেন, ‘হ্যাঁ, ভাবব। বিশেষ করে এই বৈঠকের পর।’
এই দুই নেতার বৈঠকে নতুন কোনো নীতি কিংবা সমঝোতার ঘোষণা না এলেও দুজনের শান্ত থাকার চিত্র রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বন্ধুত্বের সূচনা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকের আগেও ট্রাম্প একাধিকবার মামদানিকে ‘উন্মাদ বামপন্থী’, ‘কমিউনিস্ট’ এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বলে আক্রমণ করেছেন। মামদানিও প্রকাশ্যে ট্রাম্পের প্রতি তার আক্রোশ তুলে ধরেছেন। তবে তার দাবি, তিনি কোনো কমিউনিস্ট নন বরং নর্ডিক ধাঁচের ডেমোক্রেটিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতির কট্টর সমালোচক হলেও ইহুদিবিরোধিতার বিরুদ্ধে বারবার কথা বলেছেন। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানিয়েছেন। যা তাকে ইহুদি রাজনীতিকদের সমর্থন যোগাতে সাহায্য করেছে। এমনকি মামদানি তার প্রশাসনেও ইহুদি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।


