বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের সাবেক সিটি মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিকের চলমান বিচার প্রক্রিয়াকে ‘কৃত্রিম ও অন্যায্য’ বলে মন্তব্য করেছেন সেখানকার শীর্ষস্থানীয় কয়েক আইনজীবী। তাদের মধ্যে একজন সাবেক কনজারভেটিভ বিচার মন্ত্রীও রয়েছেন।
পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্পে রাজউকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলার রায়ের জন্য আগামী ১ ডিসেম্বর ধার্য করেছে আদালত। এই মামলায় আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও তার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক।
রায় ঘোষণার আগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে এমন মন্তব্য জানিয়েছেন ব্রিটিশ আইনজীবীরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক খবরে একথা জানানো হয়েছে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্য সরকার থেকে পদত্যাগ করা টিউলিপকে তার অনুপস্থিতিতেই রায় ও সাজা দেওয়া হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ তার জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সাজার মেয়াদ চেয়েছে।
হ্যাম্পস্টেড এবং হাইগেট এলাকার লেবার পার্টির সংসদ সদস্য টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত।
যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলামের কাছে এক চিঠিতে আইনজীবীরা বলেছেন, এই বিচারে টিউলিপকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে জানা বা আইনি প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগের অনুপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
আইনজীবীদের এই দলে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সময়ে থাকা সাবেক বিচার মন্ত্রী রবার্ট বাকল্যান্ড কেসি এবং সাবেক টোরি অ্যাটর্নি জেনারেল ডমিনিক গ্রিভ। এছাড়া রয়েছেন চেরি ব্লেয়ার কেসি, ফিলিপ স্যান্ডস কেসি এবং জিওফ্রে রবার্টসন কেসি। তারা আরও দাবি করেছেন যে টিউলিপ সিদ্দিক তার পক্ষে লড়ার জন্য যে আইনজীবীকে নিযুক্ত করেছিলেন, তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং তার মেয়েকে হুমকি দেওয়া হয়।
তারা লেখেন, ‘এই ধরনের প্রক্রিয়া কৃত্রিম এবং একটি মামলা চালানোর জন্য এটি একটি অন্যায্য ও পরিকল্পিত উপায়।’
আইনজীবীরা তাদের চিঠিতে বাংলাদেশের বর্তমান ফৌজদারি কার্যক্রম নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে এমন এক সময়ে ‘যখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বারবার বাংলাদেশে আইনের শাসন ও বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন।’
সিদ্দিক সম্পর্কে তারা বলেছেন, ‘যেহেতু তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন এবং তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিক, তাই স্পষ্টতই তিনি পলাতক নন। তিনি একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য, যার সঙ্গে হাউস অফ কমন্সে যোগাযোগ করা যেতে পারে। যদি তাকে প্রত্যর্পণে সঠিক ভিত্তি থাকে, তবে তাকে অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার জন্য বাংলাদেশে প্রত্যর্পণও করা যেতে পারে।’
আইনজীবীরা আরও দাবি করেছেন যে মামলাটি পরিচালনা করা ঢাকার দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে মিলে টিউলিপের অপরাধের দায় নিয়ে বারবার মিডিয়ার সামনে মন্তব্য করেছে।’
তাদের মতে,‘ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের মিডিয়ার সঙ্গে এমন ব্যাপক সম্পৃক্ততার মধ্যে কীভাবে হস্তক্ষেপমুক্ত একটি ন্যায্য ও নিরপেক্ষ বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে তা বুঝতে পারছি না।’
তাই টিউলিপের অনুপস্থিতিতে বিচারটি ‘অন্যায্য’ উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা বলেছেন, ‘তার নিজের পক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো যথাযথ সুযোগ নেই, বা আদৌ কোনো সুযোগ নেই, কোনো যৌক্তিকতা ছাড়াই তার অনুপস্থিতিতে বিচার করা হচ্ছে এবং এই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ন্যায্যতার মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে।’
আইনজীবীরা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি এসব ‘উদ্বেগ সংশোধন’ করে একটি ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্নের আহ্বান জানিয়েছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে গার্ডিয়ান।
২০২৪ সালে লেবার পার্টি যুক্তরাজ্যে সরকার গঠন করলে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘সিটি মিনিস্টার’-এর দায়িত্ব পান টিউলিপ সিদ্দিক। এর আগে তিনবার যুক্তরাজ্যের এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে তার খালা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত ১৪ জানুয়ারি ওই দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। তখন তার বিরুদ্ধে খালা শেখ হাসিনার সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের বিষয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছিল। যদিও এরপর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীন পরামর্শক স্যার লরি ম্যাগনাস টিউলিপের বিরুদ্ধে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত দেন যে তিনি কোনো অনিয়ম করেননি।


