টানা ভূমিকম্পে বিভিন্ন শহরে উদ্বেগ

টানা ভূমিকম্পে বিভিন্ন শহরে উদ্বেগ
ক্ষতির চিহ্ন রেখে গেছে ভূমিকম্প। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

৩২ ঘণ্টার মধ্যে দেশে চারবার ভূমিকম্প হওয়ার পর রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আরও বড় কোনও ভূমিকম্পের আশঙ্কায় মানুষজন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাসিন্দারা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, তারা ‘অবিশ্বাস্য চাপের’ মধ্যে আছেন। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে যেমন ভয় পাচ্ছেন, একই সঙ্গে অন্য শহরে থাকা আত্মীয়দের নিয়েও উদ্বিগ্ন বোধ করছেন। অনেকে আবার সাময়িকভাবে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথাও বিবেচনা করছেন।

‘লাশের স্তূপ ছাড়া কিছুই থাকবে না’

পুরান ঢাকায় উদ্বেগ আরও তীব্র। সেখানেই গত শুক্রবারের ভূমিকম্পে প্রাণ হারান তিনজন।

কসাইটুলির বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল (৩২) বলেন, ‘বড় কোনও ভূমিকম্প হলে চারদিকে শুধু লাশের স্তূপ, রক্ত আর ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছুই দেখা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকা আবাসিক ও বাণিজ্যিক- দুই ধরনেরই এলাকা। এখানে দেশের নানা জায়গা থেকে আসা অসংখ্য মানুষ থাকে। তাই বড় ভূমিকম্প হলে কতজন মারা যাবে, তা ধারণাও করা সম্ভব হবে না।’

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ বা মেরামত এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর বা আমাদের প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলার পর ব্যবস্থা নিলে কী লাভ হবে!’

ভেঙে পড়ার আতঙ্কে পরিবারগুলো

পুরান ঢাকার আরেক বাসিন্দা বিষ্ণুনাথ দাস (৫৬) বলেন, তাদের টিনের ছাদের বাড়িটি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তারপরও তার ১৫ সদস্যের যৌথ পরিবারের সবাই আতঙ্কিত।

তিনি বলেন, ‘কারণ আশেপাশে থাকা বহুতল ভবনগুলো। সেগুলো ভেঙে পড়লে আমাদের সবার প্রাণ যাবে।’

আক্ষেপ শোনা যায় তার কণ্ঠে, ‘তারপরও আমাদের সাময়িক আশ্রয়ের কোনও জায়গা নেই। সামনে যা-ই আসুক, তা মোকাবিলা করতে হবে।’

মগবাজারের রাইসুল ইসলাম (৪২) জানান, তিনি সাময়িকভাবে পাবনায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘হালকা কোনও ঝাঁকুনি টের পেলেই ভয় লেগে যায়। পরিবারকে নিয়ে সেই দূরে চলে যেতে চাই যেখানে মাথার ওপর উঁচু ভবনগুলো ঝুলে থাকে না।’

চট্টগ্রাম ও সিলেটে উদ্বেগ বাড়ছে

অন্যান্য শহরের বাসিন্দাদের উদ্বেগের বিষয়টা আর একটু জটিল। কারণ তারা নিজেদের পাশাপাশি দূরে থাকা প্রিয়জনদের নিয়েও ভয় পাচ্ছেন।

চট্টগ্রামের ছয়তলা একটি ভবনে তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন মরিয়ম খাতুন (৩২)। তার স্বামী বাইরে চাকরি করেন। মরিয়মের ভয়, বড় ভূমিকম্প হলে তিন সন্তান নিয়ে তিনি নামতেই পারবেন না।

তিনি বলেন, ‘তেমন হলে তো ভবনের নিচেই চাপা পড়তে হবে। আর যদি অলৌকিকভাবে বেঁচেও যাই, তাহলে আমার স্বামীর কী হবে? আবার দেখা হবে কি না, জানি না।’

হালিশহরের মাহবুবুর রহমান বলেন, এলাকায় অনেক ভবনই পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি বলেন, ‘গলি–রাস্তা সরু হওয়ায় ধসে পড়া ভবনগুলো বড় বিপদ ডেকে আনবে। আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ির সময় পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও আছে।’

সিলেটবাসীর আতঙ্ক আরও বেড়েছে, কারণ সাম্প্রতিক খবরে এই শহরটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সক্রিয় সাবডাকশন বেল্ট থাকার কারণে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বিক্রম আদিত্য বর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় হল খালি করার নির্দেশ পাওয়ার পর সিলেটে বাড়ি ফিরে গেছেন।

তিনি বলেন, ‘মা–বাবা বৃদ্ধ। তাদের অন্য কোথাও নেওয়ার জায়গা নেই। সামান্য ঝাঁকুনি হলেই লেগে যায়।  ভয় পেয়ে যান। তাদের পাশে থাকার জন্যই চলে এসেছি।’

৩২ ঘণ্টায় চার ভূমিকম্প

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ভূমিকম্পের ধরণ সতর্কবার্তা হতে পারে।

শুক্রবারের ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন ছিল। এরপর শনিবার সকালে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার আরেকটি হয়, এরপর বিকালে ৬টা ৬ মিনিটে টানা দুটি কম্পনের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭ ও ৪ দশমিক ৩।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রথম দুটি ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জ–নরসিংদী এলাকায়, আর পরের দুটি ছিল রাজধানীর ভেতর।

ভূতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার এবং মেহেদি আহমেদ আনসারি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এগুলো ভূমিকম্পের ‘ফোরশক’ কিনা তা বোঝার জন্য আগামী তিন–চার দিন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

তারা সতর্ক করে বলেছেন, ভারতীয় টেকটোনিক প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে ঢুকে যাওয়ার ফলে যে সক্রিয় সাবডাকশন জোন সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে জমে থাকা চাপের পরিমাণ অনুযায়ী বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাদের মতে, গত শত বছরে বাংলাদেশ বড় কোনও ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়নি, অথচ ঐতিহাসিকভাবে প্রতি ১০০–১৫০ বছরে বড় ভূমিকম্প দেখা গেছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে টাইমস অব বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রাম প্রতিনিধি সহায়তা করেছেন।)

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad