চুয়েটের অচলাবস্থা নিরসনে সিন্ডিকেটের তিন সিদ্ধান্ত

চুয়েটের অচলাবস্থা নিরসনে সিন্ডিকেটের তিন সিদ্ধান্ত
নতুন উপাচার্যকে লাল কার্ড প্রদর্শন করছেন ভিসি পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে তিনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। দ্রুত শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর আহ্বান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অংশীজনদের নিয়ে মতবিনিময় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিরপেক্ষ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় চুয়েটের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের আহ্বানে অনলাইনে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় উপাচার্যসহ ছয়জন সদস্য অংশ নেন। তবে উপাচার্য ছাড়া চুয়েটের অন্য কোনো শিক্ষক সদস্য সভায় উপস্থিত ছিলেন না।

সিন্ডিকেটের সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চুয়েটের চলমান অচলাবস্থা এবং শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে ক্ষতির আশঙ্কার মধ্যে এ সভা অনুষ্ঠিত হলো।

শিক্ষা কার্যক্রম চালুর আহ্বান

সিন্ডিকেটের প্রথম সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া এবং সম্ভাব্য সেশনজট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বার্থ, শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দ্রুত নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর উদ্যোগে ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়। দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার কারণে একাডেমিক কার্যক্রমে যে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা এবং শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোই এ সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।

অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ

ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অংশীজনদের নিয়ে সমন্বিত আলোচনা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট।

এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি মতবিনিময় সভা আয়োজনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

আলোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি ও বক্তব্য পর্যালোচনা করে চলমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করছে সিন্ডিকেট।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কমিটি গঠনের সুপারিশ

চলমান সংকটের সমাধান এবং শিক্ষা কার্যক্রম টেকসইভাবে পুনরায় চালুর লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত বা পরামর্শক কমিটি গঠনের সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত কমিটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত পর্যালোচনা করে সংকটের গ্রহণযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রস্তাব দেবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার উপায় নির্ধারণেও কমিটির ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হয়েছে।

সভায় ছিলেন ছয় সদস্য

চুয়েটের সিন্ডিকেটে মোট সদস্যপদ ১৭টি। এর মধ্যে সহ-উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের পদ শূন্য থাকায় কার্যকর সদস্যসংখ্যা ১৫। শুক্রবারের সভায় উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাড়াও অংশ নেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী, চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান এবং প্রকৌশলী খান আতাউর রহমান।

সভায় চুয়েটের অন্য কোনো শিক্ষক সদস্য উপস্থিত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান। চুয়েটনিউজ২৪-কে তিনি বলেন, উপাচার্য ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোনো শিক্ষক সদস্য সভায় অংশ নেননি। সভার বিষয়ে উপাচার্য নিজেই বিস্তারিত জানাবেন বলে তিনি এ বিষয়ে আর মন্তব্য করতে চাননি।

এদিকে সিন্ডিকেটের সদস্যসচিবের দায়িত্বে থাকা রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, তিনি আগেই রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। ফলে সিন্ডিকেটের সদস্যসচিব হিসেবেও তিনি আর দায়িত্বে নেই বলে দাবি করেছেন।

সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

নিয়োগকে কেন্দ্র করে অচলাবস্থা

গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এ নিয়োগের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল করতে হবে।

একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচি পালন করছেন। এতে বন্ধ রয়েছে ক্লাস, পরীক্ষা ও অধিকাংশ একাডেমিক কার্যক্রম।

এ পরিস্থিতির মধ্যে গত ১২ অক্টোবর উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ক্যাম্পাসে গেলে তাকে উপাচার্য ভবনে অবরুদ্ধ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সেখানে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবস্থানের পর ১৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় তাকে বের করে নেওয়া হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে ১৫ অক্টোবর তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ফিরে যান। সেখান থেকেই শুক্রবার সন্ধ্যায় অনলাইনে সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন।

তবে সিন্ডিকেটের তিন সিদ্ধান্তের পরও চুয়েটে চলমান অচলাবস্থা কবে কাটবে এবং কবে থেকে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad