হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রউফ এ বছর সাড়ে আট বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। বর্তমানে জেলাজুড়ে শ্রমিক সংকট চলায় তিনি হারভেস্টার মেশিনের সাহায্যে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেন। তবে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে ধান কাটতে গিয়ে তাকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে ফসল কাটার খরচ তার দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। এতে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন এই কৃষক।
আব্দুর রউফ জানান, জেলার বাইরে থেকে পর্যাপ্ত ধান কাটার শ্রমিক না আসায় তিনি যন্ত্রের ওপর নির্ভর করছেন। গত বছর হারভেস্টার মেশিনে প্রতি বিঘা জমির ধান কাটতে তার খরচ হয়েছিল ১৭শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা। অথচ এ বছর একই পরিমাণ জমির ধান কাটতে তাকে সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা গুণতে হচ্ছে। তেলের দাম ও সংকটকে কেন্দ্র করে এই বাড়তি খরচ তাকে বিপাকে ফেলেছে।
জেলায় কর্মরত হারভেস্টার মেশিনের মালিকরা জানান, তারা পেট্রোল পাম্প থেকে চাহিদানুযায়ী ডিজেল পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তারা খুচরা দোকান থেকে অনেক বেশি দামে তেল সংগ্রহ করেন। এ কারণে তারা ধান কাটার মজুরি বাড়িয়ে দিয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে দ্বিগুণ টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতে লোকসান এড়াতে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য দাবি করছেন সাধারণ কৃষকরা।
কৃষক শাহ আলমের মতে, শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে সময়মতো হারভেস্টার মেশিনও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সোনার ফসল ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
আরেক কৃষক আকবর হোসেন বলেন, মেশিনের মালিকরা সুযোগ বুঝে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। আর ফসল নষ্ট হওয়ার ভয়ে চড়া দামেই ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। এর ফলে এ বছর ধান চাষ করে লাভের বদলে বড় অঙ্কের লোকসান হবে বলে আশঙ্কা কৃষকদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জ জেলায় এক লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে সাত লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। এসব ধান কাটার জন্য জেলায় ৪৩২টি হারভেস্টার মেশিন প্রস্তুত রয়েছে। তবে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক মেশিন এখনও মাঠে নামানো সম্ভব হয়নি।
একটি হারভেস্টার মেশিন চালাতে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ লিটার ডিজেল দরকার। অথচ পেট্রোল পাম্প থেকে হারভেস্টার মেশিনের মালিকরা মাত্র ২০ থেকে ৩০ লিটার তেল সংগ্রহ করতে পারছেন। মেশিন মালিক আরিফ আহমেদ জানান, ডিজেল সংকটের কারণে তাদের পরিচালনা ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাই কৃষকদের কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।
এই পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করেছেন হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বনি আমিন খান। তিনি জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে সব হারভেস্টার মেশিন একযোগে কাজ শুরু করতে পারেনি। তবে কৃষকরা যাতে দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারেন সেজন্য কৃষি বিভাগ কাজ করছে। পাম্প থেকে সহজে তেল পেতে কৃষকদের কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হারভেস্টার মেশিনে তেল দেওয়ার জন্য পাম্প মালিকদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


