শ্বেতহস্তীতে পরিণত হতে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দেশের জ্বালানি খাতের বড় প্রকল্প। মহেশখালী সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ও ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বিপুল বিনিয়োগের পরও সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসছে না। আধুনিকায়ন আর বিশাল সাশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রকল্পের সুফল এখন সুদূরপরাহত।
গত এক দশকে মহেশখালী এসপিএম এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং উচ্চ খরচ ও লোকসান কমানোর লক্ষ্যেই মূলত এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই দুই প্রকল্প থেকে বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় হবে বলে কর্মকর্তারা আগে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এসপিএম প্রকল্প থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। আবার ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনটিও এর সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম পর্যায়ে চলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে দেশে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে তা মোকাবিলায় এসব প্রকল্প বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
এসপিএম প্রকল্পে সুফল মিলছে না
জ্বালানি খাতের আধুনিকায়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এসপিএম প্রকল্পটি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার বড় ব্যবধানকে স্পষ্ট করেছে। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ৮ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে এই অফশোর টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় জাহাজগুলো গভীর সমুদ্র থেকেই সরাসরি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্বালানি খালাস করতে পারে। আগে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে এই কাজে প্রায় ১১ দিন সময় লাগত।
এই টার্মিনালটি বছরে ৯০ লাখ টন জ্বালানি খালাস করার ক্ষমতা রাখে। এটি ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির সাথে যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা থাকে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই প্রকল্প। কিন্তু ২০২৪ সালের মার্চ মাসে উদ্বোধনের পর এক বছর পার হয়ে গেলেও এই টার্মিনালটি এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই সমস্যার মূলে অবকাঠামো নয় বরং পরিচালনাগত ব্যর্থতা দায়ী। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এখন পর্যন্ত এই জটিল কারিগরি ব্যবস্থার জন্য কোনো অভিজ্ঞ অপারেটর নিয়োগ দিতে পারেনি। কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও যোগ্য কাউকে পাওয়া যায়নি। এর ফলে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যে আশা ছিল তা পূরণ হচ্ছে না।
পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিকল্পনা ও পরিচালনা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জামান নাহিদ রায়হান জানান, এই সুবিধা চালু করতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এই ধরনের ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা দেশের কোনো কোম্পানির নেই। তাই বাংলাদেশকে সম্ভবত কোনো বিদেশি অপারেটরের ওপরই নির্ভর করতে হবে।
তবে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় অপারেটর নিয়োগের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেনি। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস জানান, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করা হচ্ছে। তারা যত দ্রুত সম্ভব এই প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন।
রিফাইনারি সংকটে এসপিএমের সীমাবদ্ধতা
কর্মকর্তারা জানান, এসপিএম প্রকল্পটি এখনই পুরোপুরি চালু করা হলেও এটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারবে না। এর প্রধান কারণ ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে দীর্ঘ বিলম্ব।
এই অফশোর টার্মিনালটি বছরে ৯০ লাখ টন অপরিশোধিত তেল খালাস করতে পারলেও ইস্টার্ন রিফাইনারি বর্তমানে মাত্র ১৫ লাখ টন তেল শোধন করতে পারে। যদিও রিফাইনারির সাথে যুক্ত ফিডিং সিস্টেমটি বছরে ৪৫ লাখ টন তেল সরবরাহে সক্ষম। এর ফলে শোধন ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রায় ৩০ লাখ টনের একটি বড় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই অসামঞ্জস্যের কারণে পাইপলাইন অবকাঠামোটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে বাংলাদেশকে এখনো চড়া দামে বিদেশ থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে।
এই সমস্যার মূলে রয়েছে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২’ প্রকল্পের কাজ ঝুলে থাকা। গত ১৫ বছর ধরে উন্নয়নের তালিকায় থাকা এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে বর্তমানে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রকল্পের কাজ শেষ হতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। নতুন এই ইউনিটটি চালু না হওয়া পর্যন্ত এসপিএম প্রকল্পটি তার পূর্ণ সুফল দিতে পারবে না।
পাইপলাইনের যান্ত্রিক ত্রুটিতে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত
ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরণের চিত্র দেখা যাচ্ছে। তিন হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি ২০২৫ সালের আগস্টে উদ্বোধন করা হয়। সড়ক ও নদীপথের ধীরগতি এবং চুরির ঝুঁকি এড়াতে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের সময় ৪৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ১২ ঘণ্টায় আনার লক্ষ্য ছিল। এছাড়া সিস্টেম লস শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশে নামানোর কথা ছিল।
কিন্তু উদ্বোধনের পরেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এর নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষামূলক চালানোর সময় কর্মকর্তারা জ্বালানি লোকসানের অসংগতি দেখতে পান। এর ফলে উদ্বোধনের অল্প সময়ের মধ্যেই এর নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে এই পাইপলাইনটি মাঝে মাঝে চালানো হচ্ছে। প্রকৌশলীরা ক্যালিব্রেশন, চাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ত্রুটিগুলো সারাতে কাজ করছেন।
জামান নাহিদ রায়হান জানান, পাইপলাইনটি বর্তমানে সীমিত পরিসরে চলছে। তবে সব ত্রুটি সারিয়ে এটি কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি।
বিলম্বের কারণে জনগণের অর্থের অপচয়
প্রকল্প বাস্তবায়নে এই বিলম্বের আর্থিক প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়ছে, জনগণের অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি আমদানির জন্য প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী অবকাঠামো ব্যবহার করতে না পারা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার পদ্ধতিগত অদক্ষতাও প্রতি বছর শত কোটি টাকার ক্ষতি করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন এই সমস্যাগুলো শুধুমাত্র কারিগরি নয়। এর গভীরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সুশাসনের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে আধুনিক অবকাঠামো কোনো কাজে আসবে না। এই দীর্ঘ বিলম্বের পেছনে কোনো অব্যবস্থাপনা বা দুর্নীতি রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য দাবি জানান তিনি।


