‘মব ভায়োলেন্স’ দমনে ব্যর্থতার কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে সদ্য নির্বাচিত বিএনপি সরকার। সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কিছু সহিংস ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি অনেকটা আগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের চিত্রকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ক্ষমতা গ্রহণের দুই মাস পার না হতেই ঢাকার শাহবাগ এবং কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরের সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলো এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ওই এলাকাগুলোতে দিনের আলোতে প্রকাশ্যে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের উপস্থিতিতেই এসব সহিংসতা চালানো হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মব সংস্কৃতি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এরপর একের পর এক ঘটা সহিংস ঘটনা সেই প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। সরকারের কথা এবং কাজের মধ্যে একটি বড় দূরত্ব দেখা যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নির্বাচনের পর মব বা গণপিটুনির ঘটনা কিছুটা কমলেও বর্তমানে তা আবার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। হিউম্যান রাইটস কালচার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী প্রধান সাইদুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বর্তমান প্রশাসন যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পথেই হাঁটে তবে তারা জনগণের আস্থা হারাবে।
সাইদুর রহমান আরও বলেন, যদি কাজের ধরনে কোনো পরিবর্তন না আসে তবে ফলাফলও আলাদা হবে না। সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে সরকারকে রাজনৈতিক পরিণতির শিকার হতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৭ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তৌহিদী জনতার ব্যানারে কিছু গোষ্ঠী ভয় ও অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই সময়ে ৪১৩টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছিল। ওই সব ঘটনায় ২৫৯ জন নিহত এবং ৩১৩ জন আহত হন। সেই সময়ে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো সংবাদমাধ্যমে হামলা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছিল।
বিএনপি সরকারের আমলেও একই ধরনের ধারা চলতে দেখা যাচ্ছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবং তিন কর্মকর্তাকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বরিশাল আদালত চত্বর এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণেও মব হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে আইনজীবীদের চেম্বার ভাঙচুর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে মব তৈরি করে সহিংসতা চালানোর একাধিক অভিযোগ সামনে আসে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে চলতি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর শুধু মার্চ মাসেই ২৫টি পৃথক ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ৩৮ জন আহত হয়েছেন।
গত ৪ মার্চ মুন্সিগঞ্জের লৌহজং এলাকায় চুরির অভিযোগে সাগর ও সানারুল নামের দুই ব্যক্তিকে রাতভর গাছের সাথে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়ে গত শনিবার বিকালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের এক পীরকে হত্যা করা হয়েছে। একটি পুরনো ভিডিওর সূত্র ধরে তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুলিশের সামনেই তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারা হয়েছে। হামলাকারীরা তার মাজার ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, পুলিশ চেষ্টা করেও হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। হামলাকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি থাকায় পুলিশ তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। শিগগিরই এ হত্যাকাণ্ডের মামলা হবে।
এর আগের দিন শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার শাহবাগ এলাকায় জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমকামিতার অভিযোগে কয়েকজনকে মারধর করা হয়। আজাদি আন্দোলন ব্যানারে মিছিলকারীরা ভুক্তভোগীদের ওপর হামলা চালায় এবং এক নারী ভুক্তভোগীর পোশাক ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করে।
ভুক্তভোগী কাজী তাহসিন জানান, তাকে মাথায়, বুকে, পিঠে ও যৌনাঙ্গে আঘাত করা হয়েছে। সবাইকে আলাদা করে নিয়ে এককভাবে মারধর করা হয়েছে বলে তিনি জানান। শাহবাগ থানার খুব কাছে এই ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কার্যকর ভূমিকা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা মামলা করতে চাইলেও পুলিশ প্রথমে মামলা নিতে চায়নি, পরে সাধারণ ডায়েরি হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তবে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, পুলিশ কোনো আসামিকে শনাক্ত করতে পারেনি। আজাদি আন্দোলন নামের কোনো সংগঠনের কথাও তিনি জানেন না।
রাজধানীর শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাঁদাবাজি ও হুমকির অভিযোগ উঠেছে। একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে মব ব্যবহার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চড়া দামে সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য করার অভিযোগ করা হয়েছে। প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ কামরুল ইসলাম এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ জনসমক্ষে আনেন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই ঘটনাগুলো একটি বিপজ্জনক প্রবণতা প্রকাশ করছে। সাইদুর রহমান বলেন, নির্বাচনের পর সাময়িকভাবে সহিংসতা কমলেও বর্তমানে তা আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তৌহিদী জনতার ব্যানার ব্যবহার করে কিছু গোষ্ঠী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সাইদুর রহমানের মতে, তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে জামায়াত-শিবিরের সমর্থকরা কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যানার ব্যবহার করে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তারা এই ব্যানারকে অস্থিরতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। তবে মূল সমস্যা হলো অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় না আনা। দায়ীদের কার্যকর শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না বলে তিনি মনে করেন।
মবের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের কোনো পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয় বলে জানান নূরুল হুদা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রমাণের জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেই বোঝা যাবে যে সরকার এই বিষয়ে আন্তরিক।
বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি জানান, দেশব্যাপী পুলিশ ইউনিটগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই সমস্যা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে সমাজের সব স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন।
সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন মব ভায়োলেন্সকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং কখনো সুপরিকল্পিত হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিকল্পিত মব নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এই সংকটের বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে বারবার ফোন ও মেসেজ করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মব সহিংসতা অব্যাহত থাকায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। সমালোচকদের মতে, সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তারা মনে করেন, দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।


