জুলাই-আগস্টে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা

জুলাই-আগস্টে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিন। ছবি: তথ্য মন্ত্রণালয়
Advertisement
Advertisement

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সারা দেশে সহিংসতায় কতজন নিহত হয়েছেন, এই সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে গেজেট তৈরি করেছে, তাতে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা বলা হয়েছে ৮৪৪ জন।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে জুলাইয়ে ৩৩৪ ও আগস্টে ৬২৬ জন, মোট ৯৬০ জন নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০। এই হিসাবে পুলিশ রেকর্ডে প্রায় ৫০০ জনের হত্যার হিসাব নেই। প্রশ্ন উঠেছে, কার তথ্য সঠিক?

পুলিশের তথ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের ব্যবধান প্রায় ৫০০। জাতিসংঘের তথ্য সঠিক হলে, ওই ৫০০ মরদেহ কোথায় এবং সেসব ঘটনায় কেন মামলা হয়নি? তখন থানায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতি না থাকায় উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীসহ অনেক স্থানে নিহতদের মরদেহ স্বজনেরা নিয়ে দাফন করেছেন।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘পুলিশের তথ্য নথিভুক্ত রযেছে। মামলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে পুলিশ পরিসংখ্যান তৈরি করে থাকে। এখানে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

ওই সময়ে ৪৪ পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী নিহত এবং বেওয়ারিশ দাফনের হিসাব পুলিশের কাছে আছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেউ মামলা না করলে সেই পরিসংখ্যান পুলিশ রেকর্ডে থাকার সুযোগ নেই।’

জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সঙ্গে ব্যবধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে এসব নিয়ে গবেষণা হয়। ব্যবধানের কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা হতে পারে।’

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান ঘিরে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮৭৫ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই মারা যান নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে।

আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম গত বছরে জুলাই ও আগস্টে ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে ১১৪টি ও জুরাইনে দাফন করা হয়েছে ৬টি বেওয়ারিশ মরদেহ।

বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা অনেকেই আন্দোলনে নিহত। সরকারি হিসাবে ওই সময়কার বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা নথিভুক্ত নেই।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানান, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে মোট ২৬৪ মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসে। এদের মধ্যে মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল ১৭৪ জনের মরদেহ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে চিকিৎসাধীন মারা যান ৯০ জন।

মৃত অবস্থায় যে ১৭৪ জনের মরদেহের আনা হয়েছিল, এর মধ্যে ৯১টি লাশ জরুরি বিভাগ থেকেই ময়নাতদন্ত ছাড়া স্বজন বা পরিচিতরা নিয়ে যান। বাকি ৮৩ মনদেহের ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।

টাইমস অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নিহতের হিসাব পুলিশের সঙ্গে গড়মিল প্রসঙ্গে জানতে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী গোয়েন লুইসের কাছে ইমেইলে প্রশ্ন পাঠানো হয়। তবে, তিনি কোনো জবাব দেননি।

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) এর টিম অ্যাসিস্ট্যান্ট মোফাজ্জল হোসাইন বলেছেন, জুলাই-আগস্টের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং করতে তারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদন অনুসরণ করেছেন।

সরকারের হিসাবে আন্দোলনে নিহত যে ৮৪৪ জনের নামে গেজেট করেছে, সেখানেও কারও কারও নাম একাধিকবার এসেছে। সে কারণে তালিকায় কাটাছেঁড়াও করতে হচ্ছে।

আন্দোলন যখন চূড়ান্তরূপ নেয়, তখন ঢাকার উত্তরা, ইউসিবি চত্বর, বনশ্রী, রামপুরা, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ি এলাকা ছিল রণক্ষেত্র।

উত্তরায় শহীদ মনুসর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ক্রিসেন্ট হাসপাতালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীকে ভর্তি করা হয়। ঘটনাস্থলে মারা গেলেও এসব হাসপাতালে যাদের নেওয়া হয়েছে, সেসব মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনেরা নিয়ে গেছেন।

বনশ্রীর ফরাজী হাসপাতাল লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রুবেল হোসাইন জানান, কোটাবিরোধী আন্দোলনে ১৮-২০ জুলাই পর্যন্ত রামপুরায় নিহত ৮ জনের মরদেহ হাসপাতাল থেকে লোকজন পুলিশকে না জানিয়ে নিয়ে যান।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন জানান, ময়নাতদন্ত ছাড়া গেছে এমন কোনো ডকুমেন্ট নেই। শাওন নামে একজন স্টাফ ওই সময়কার হতাহতের হিসাব রাখেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী বলেছেন, ‘সারা দেশের জেলা প্রশাসন ও হাসপাতালগুলোর তথ্য নিয়ে তারা নিহতের হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছে।’

গেজেট আকারে তালিকা প্রকাশের পর অভিযোগ আসলে তদন্ত করে কিছু নাম গেজেট থেকে বাতিল হচ্ছে। সরকারি গেজেটে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে নিহতদের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছরের জুলাই-আগস্টে শুধু আন্দোলনকারী নয়, নিহত হয়েছিল ৪৪ পুলিশ ও অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। তাদের তালিকায় নিহত পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সংখ্যা যুক্ত নেই। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা অনেককে গেজেট তালিকাভুক্ত করা হয়নি।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী বলেন, ‘বেওয়ারিশ হিসেবে যাদেরকে দাফন করা হয়েছে, তারা আসলে কারা ছিল, সেটি শনাক্ত করার জন্য তদন্ত শুরু করেছি আমরা। সেই সংখ্যাটা ঠিক কত তা এখনো জানা নেই। তবে তদন্তের পর আমরা বলতে পারব।’

শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্ত বিশেষ সেল নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রথম ধাপের খসড়া তালিকা প্রকাশ গত বছরের ২১ ডিসেম্বর। সেই তালিকায় নিহতের সংখ্যা দেখানো হয়েছিল ৮৫৮ জন এবং আহতের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৫৫১ জন। গত ১৬ জানুয়ারি নিহতদের তালিকা নিয়ে প্রথম গেজেট প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

প্রকাশিত প্রথম গেজেটে সারা দেশের নিহত ৮৩৪ জনকে ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের নাম পরিচয়ও তুলে ধরা হয়।

এর প্রায় ছয় মাস পরে চলতি বছরের ৩০ জুন আবারও তালিকা হালনাগাদ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। যেখানে নিহতের সংখ্যা ১০ জন বাড়িয়ে ৮৪৪ জনের নামের হালনাগাদ গেজেট প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশে গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআরর) এই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগের মৃত্যু হয়েছে রাইফেল ও শটগানের গুলিতে।

এতে উল্লেখ করা হয়, এই সময়ে আরও হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ছাড়া পুলিশ ও র‍্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ১১ হাজার ৭০০ জনকে তখন আটক করা হয়েছিল। যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ শিশু।

যাত্রাবাড়ি, চানখারপুল, বংশালসহ কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষে হতাহতদের স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নিহতদের মরদেহ স্বজনেরা নিয়ে যান ময়নাতদন্ত ছাড়া। এর মধ্যে ৪ আগস্ট যাত্রাবাড়ি থেকে যাওয়া ১০টি মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে যাওয়া হয়।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মফিজুর রহমান মোল্লা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারেননি। মর্গ সহকারী (ডোম) শ্যামল লাল জানান, সেখানে দুটি লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad