জামায়াত এমপির মেয়ের নামে দুস্থ তহবিলের টাকা

জামায়াত এমপির মেয়ের নামে দুস্থ তহবিলের টাকা
Advertisement
Advertisement

রাজনীতিতে নতুন এলে নাকি অনেক কিছুই বোঝা যায় না। তবে নড়াইল-২ আসনের নতুন সংসদ সদস্য (এমপি) আতাউর রহমান বাচ্চুর ‘বুঝতে না পারার’ বহর দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! তার ঐচ্ছিক তহবিল থেকে দুস্থদের মধ্যে টাকা বিতরণের যে তালিকা তৈরি হয়েছে, তাতে অন্য কোনো গরিব-দুঃখীর নাম থাক বা না থাক, নিজের মেয়ের নাম স্থান পেয়েছে দুই-দুই বার! তাও আবার বাবার নাম দুই জায়গায় দুই রকম দিয়ে।

এই জালিয়াতির খবর সামনে আসতেই আতাউর রহমান বাচ্চুর সরল স্বীকারোক্তি—তিনি নাকি এখনো রাজনীতিতে ‘ম্যাচিউরড’ বা পরিপক্ব হননি!

ফাইজার ‘ডাবল ধামাকা’ ও বাবার নামের ভেলকি

বর্তমান সংসদের এমপিরা গত ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে শপথ নিয়েছেন। সেই হিসাবে সাড়ে তিন মাসের জন্য এমপির জনকল্যাণমূলক অনুদান তহবিল থেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা পাওয়ার কথা। সেই টাকা তোলার জন্য নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ১০ জনের একটি তালিকা পাঠানো হয়। আর সেখানেই ঘটেছে তেলেসমাতি ঘটনা।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পাঠানো তালিকার ১ নম্বর এবং ৮ নম্বরে নাম রয়েছে ‘ফাইজা’। এই ফাইজা আর কেউ নন, এমপির নিজের কন্যা নুজহাত তাবাসসুম ফাইজা। তবে জালিয়াতি পাকা করতে তালিকার ১ নম্বরে বাবার নামের জায়গায় লেখা হয়েছে ‘মো. বাচ্চু’, আর ৮ নম্বরে বাবার নাম বদলে গিয়ে হয়েছে ‘মো. আতাউর’। দুই জায়গাতেই এই ‘দুস্থ’ তরুণীর জন্য ১০ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, তালিকায় থাকা ৯ জনের ঠিকানাই লেখা হয়েছে ‘হাবোখোলা, ১ নং ওয়ার্ড, উপজেলা: নড়াইল সদর’। এমপির নিজের বাড়িও এই হাবুখালি ইউনিয়নের কোনখালি গ্রামে।

‘আমি নতুন, ম্যাচিউরড হইনি’

আরও পড়ুন

এই পারিবারিক কেলেঙ্কারি নিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়ে আতাউর রহমান বাচ্চু সমস্ত দায় চাপিয়েছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) এ এস এম গোফরানের ওপর। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘দেখুন, আমি এ রকম যে হবে বুঝিনি, জানিওনি। আমি এখনও ম্যাচিউরড হইনি, কেবল এমপি হয়েছি। টাকা কীভাবে আসবে, তাও জানি না।’

আতাউর রহমান বাচ্চুর দাবি, তিনি আগেভাগেই কিছু খালি প্যাডে সই করে রেখেছিলেন। পিএস তাড়াহুড়ো করে সেখানে কিছু চেনা-জানা নাম বসিয়ে জমা দিয়ে দিয়েছেন।

তবে মজার ব্যাপার হলো, এর মাঝেই এমপি দাবি করেন, গত রোজা ও কোরবানির ঈদে ২০ লাখ টাকা তিনি অত্যন্ত ‘স্বচ্ছতার’ সাথে প্রকাশ্যে বিতরণ করেছেন। দুই ঈদে যিনি স্বচ্ছতার সাথে টাকা বিতরণের পরিপক্কতা দেখিয়েছেন তিনিই আবার এক লাখ টাকা বিতরণের বেলায় হঠাৎ ‘ইমম্যাচিউরড’ হয়ে গেছেন।

সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, এমপি নিজেই স্বীকার করেছেন তালিকায় যাদের নাম আছে তারা কেউ এই অনুদান পাওয়ার যোগ্য নন! তবে সরকারি নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তার দাবি, তালিকায় নাম যারই থাকুক—টাকা তিনি অন্য মানুষকে দেবেন এবং সেই ক্ষমতাও তার আছে।

দায় যখন পিএসের ‘কম্পিউটার দোকানের’

এদিকে এমপির পিএস গোফরানের যুক্তি আরও এক কাঠি সরেস। তার দাবি, সংসদ সচিবালয় থেকে যখন হুট করে তালিকা চাওয়া হয়, তখন তার হাতে মোটেও সময় ছিল না। তিনি বাইরে থাকায় এক ‘কম্পিউটার দোকানে’ ফোন করে তালিকাটি তৈরি করতে বলেন। গোফরানের দাবি, সেই কম্পিউটার দোকানদারই ভুল করেছে।

তবে এক মেয়ের নাম দুই জায়গায়, তাও আবার দুই রকম বাবার নাম কিভাবে ভুল করে ঢুকল—সেই প্রশ্নে পিএসের বিরক্ত জবাব, ‘ভুল হয়ে গেছে’। অবশ্য এই ‘ভুলের’ খেসারত হিসেবে পিএস গোফরানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আতাউর রহমান বাচ্চু।

এদিকে এই হরিলুটের বিষয়ে নড়াইল সদরের ইউএনও টি এম রাহসিন কবিরকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। আর জেলার ডিসি মোহাম্মদ আবদুল সালাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তার জানা নেই।

একই পথের পথিক জামায়াতের আরেক এমপি

নতুন এমপিদের এই ‘তহবিল-প্রীতি’র ঘটনা কিন্তু একক কোনো ঘটনা নয়। খুলনা-৬ আসনের জামায়াত এমপি আবুল কালাম আজাদও কোরবানির ঈদের আগে ত্রাণ তহবিলের ১০ লাখ টাকা বিতরণে একইরকম ‘মহানুভবতা’ দেখিয়েছেন। তার স্বাক্ষরিত তালিকার ১ নম্বরে থাকা উপকারভোগী হলেন নিজের আপন ভাগনে ও ব্যবসায়ী আহসান হাবিব। ৫ নম্বরে থাকা আরেক উপকারভোগীর রয়েছে অঢেল সম্পদ ও পাকা বাড়ি। আর ৬ ও ১০ নম্বরে আছেন ছাত্রশিবিরের স্থানীয় দুই থানার সভাপতি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad