জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ

জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ
ঝালকাঠি-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ফয়জুল হক (মাঝে)। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

নির্বাচনের মাঠে প্রচার-প্রচারণায় ‘শেষ অস্ত্র’ হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করছে জামায়াতে ইসলামী। পুরুষের পাশাপাশি নারী কর্মীদের দিয়েও সহজ-সরল ভোটারদের প্রভাবিত করতে দলটির প্রচেষ্টা এখন আলোচনায়। জামায়াতের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নিয়ে বেশ জোরালো আলোচনা চলছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হলেও ইতোমধ্যে দলগুলো জোরেসারে মাঠে নেমেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী প্রায় এক বছর আগে থেকেই আসনভিত্তিক প্রার্থী চূড়ান্ত করে প্রচারণা চালাচ্ছে।

দলটির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একের পর এক ‘ধর্মভিত্তিক বিতর্কিত’ প্রচারের অভিযোগ ওঠায় কয়েকজন নেতাকে শোকজ ও সতর্ক করা হয়েছে। এরপরও একই ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকায় সংগঠনটিকে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।

অবশ্য জামায়াত নেতারা বলছেন, এসব অভিযোগ স্রেফ অপপ্রচার। ধর্মভিত্তিক দল হওয়ায় ধর্মকে ট্যাগ হিসেবে ব্যবহার করে একটি পক্ষ দলের বিরুদ্ধে এমন প্রচার চালাচ্ছে বলে তাদের দাবি।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জামায়াতের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে বিএনপিসহ অনেকে এমন অভিযোগ তুলছেন। দলের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচারণা কোনো কাজে আসবে না। ইসলামী দল হিসেবে মানুষকে ধর্মের কথা বলা আর ধর্মকে অপপ্রচার হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।’

সম্প্রতি জামায়াতের কয়েকজন প্রার্থী বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনায় এসেছেন। সবশেষ ঝালকাঠি-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ফয়জুল হকের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

গত ৭ জানুয়ারি রাতে নির্বাচনী এলাকা রাজাপুরে ভোট প্রার্থনার সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘বিড়ি যে দোকান থেকে খাবেন, সেখানে গিয়ে বিড়ি ধরিয়ে একটা সুখ টান দিয়ে বলবেন—দেশের অবস্থা দেখছেন? দাঁড়িপাল্লা ছাড়া তো আর মানুষ দেখি না। এমনও হতে পারে, আমার কোনো ভাই হয়তো ইবাদত করার সুযোগ পায় নাই। কিন্তু ওই সুখ টান দেওয়া বিড়ির মধ্যেও যদি সে দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দেয় এবং তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিতে পারেন।’

আরও পড়ুন

এই ঘটনায় নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে গত ৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ফয়জুল হককে শোকজ করে।

এদিকে গত ১০ জানুয়ারি রংপুরের পীরগাছার কদমতলা এলাকায় একটি মতবিনিময় সভায় রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির ও রংপুর-৪ আসনের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানো এ টি এম আজম খান বলেন, ‘২৮ তারিখ (ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ছয়টায় কেন্দ্র থেকে মোবাইল করল আমাকে। খান সাহেব, আপনাকে তো কোরবানি দেওয়া হলো। আমি বললাম, এই কোরবানি কি ইব্রাহিম (আ.)-এর ছেলে ইসমাইল (আ.)-এর? তখন বললেন, হ্যাঁ, এর চেয়েও বড়।’

আমি বললাম, এর ব্যাখ্যা দিলে ভালো হতো। তখন বলা হলো, ‘আসলে ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ কোরবানি হয়নি, হয়েছে দুম্বা। আর আপনার কোরবানি বলতে পীরগাছা-কাউনিয়ার লাখ লাখ নারী-পুরুষের কোরবানি। এ জন্যই এই কোরবানিটা বড় কোরবানি।’

এই দুই ঘটনা নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের ঘটনাকে কোরবানির সঙ্গে তুলনা করায় নানা মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও পাবনা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, জামায়াত ধর্মকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মগজ ধোলাই করছে। বিশেষ করে তাদের নারী কর্মীরা পুরুষ লোক বাড়িতে না থাকার সময় গ্রামের সহজ-সরল নারীদের কাছে ভোট প্রার্থনার নামে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে প্রতিশ্রুতি আদায় করছে।’

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগেও ধর্মকে ব্যবহার করে জামায়াতের তৎপরতার বিরুদ্ধে সচেতন হতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। অনেকের মতে, জামায়াত একটি ধর্মভিত্তিক দল হিসেবে তাদের রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে। তবে বিএনপিসহ অন্যান্য দলের উচিত ভোটারদের সামনে কার্যকর কাউন্টার প্রচারণা নিয়ে আসা। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে জামায়াতকে মোকাবিলায় দলগুলোর তেমন প্রস্তুতি চোখে পড়ছে না।

এর আগেও গত ১৩ নভেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় শাহজাহান চৌধুরীর মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

তিনি বলেন, ‘খবরদার, আমি শাহজাহান চৌধুরী। আমাকে যারা চেনে না, তারা মাটির নিচে বসবাস করে। আমার জন্য আল্লাহ আছেন। আল্লাহ আমাকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে, আল্লাহর মেহেরবানিতে সূর্য আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে।’

এই বক্তব্যের জেরে তাকে দল থেকে শোকজ করা হয়। এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা ও জামায়াতের সংসদ সদস্য প্রার্থী আমির হামজা কোরআন-হাদিস নিয়ে বারবার বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ায় দলীয় হাইকমান্ড তাকে এ ধরনের মন্তব্য এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়।

এদিকে সিনিয়র আইনজীবী ও সুনামগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনির ‘রোজা ও পূজা’ নিয়ে বক্তব্য দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর