সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোটের প্রশ্নে বিএনপি এখন ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি এক ধরনের কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। দলটি প্রকাশ্যে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সক্রিয় নির্বাচনী প্রচারে নামছে না। আবার জুলাই জাতীয় সনদে সই করা দল হিসেবে ‘না’ ভোটের পক্ষেও জোরালো অবস্থান নিতে পারছে না। এটিকে অনেকেই দেখছেন উভয় সংকট হিসেবে।
বিএনপির তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৌশলগত কারণেই দলটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্য ও জোরালো প্রচার থেকে দূরে রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরোধী অবস্থানে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল গণভোট এবং বিশেষ করে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিরোধিতা করছে। এসব দলের ভোটারদের আকৃষ্ট করার কৌশল হিসেবেই বিএনপি প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–কোনোটির পক্ষেই নির্বাচনী প্রচারে নামছে না বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে বিএনপির একাধিক নেতা বলছেন, বাস্তবে দলটি সংস্কারের বিরোধী নয় এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিরুদ্ধেও নয়। প্রকাশ্যে প্রশ্ন করা হলে অনেক নেতার উত্তর ‘না’। আবার ভেতরে ভেতরে ‘না’-এর প্রতি সহানুভূতি থাকলেও প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’-এর কথা বলতে হচ্ছে অনেককে। এ ছাড়া দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা প্রকাশ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের কিছু নেতার দলীয় অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে। নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে দলীয় কাঠামোয় নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্য কারও চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ কিংবা মনোনয়নবঞ্চিতদের সংসদের উচ্চকক্ষে যাওয়ার পথও খুলতে পারে। এমন বাস্তবতায় দলের শীর্ষ নেতাদের একাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলছেন।
বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অধিকাংশ নেতাকর্মী ও দলের সমর্থকদের বড় একটি অংশ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে নন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। যদিও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একাধিক বৈঠকে সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিলেও শেষ পর্যন্ত কমিশনের সঙ্গে ভিন্নমত বহাল রাখেনি দলটি। বরং জাতীয় নির্বাচনের স্বার্থে কোনো প্রতিবাদী অবস্থান নেয়নি বিএনপি।
একই সঙ্গে দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগতভাবে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। গণভোটের প্রশ্নপত্রে ব্যবহৃত ভাষাও জটিল বলে অভিযোগ রয়েছে। চারটি প্রশ্ন থাকলেও ভোটারদের সামনে উত্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে মাত্র একটি–‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। সীমিত সময়ের মধ্যে ব্যালটের প্রশ্ন পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক ভোটারের জন্য কঠিন হতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার দেশজুড়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছে। সরকারের প্রতিনিধিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও এ প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। সরকারপক্ষের ভাষ্য, ‘না’ জয়ী হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই এবং আগামী চার সপ্তাহে প্রচারণা আরও জোরদার করা হবে। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসপি), ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন ও এবি পার্টিসহ মোট আটটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এসব দল দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসছিল। পরে একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সম্মতি দেয় তারা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে প্রচার চালাচ্ছে দলগুলো।
দলগুলোর নেতাদের ভাষ্য, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট অপরিহার্য। তাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ নির্মাণ। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ কার্যকর করতে সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক সংশোধনীতে জনগণের সরাসরি সম্মতি যাচাই করতেই জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, গণভোটে যারা ‘না’-এর পক্ষে যাবেন, তারা সংসদ নির্বাচনে জিততে পারবেন না। তিনি বলেন, জুলাই সনদকে আইনগত ভিত্তি দিতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তাদের দল প্রচারনা চালাচ্ছে এবং জনগণও এ প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বলার জন্য প্রস্তুত।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমস অব বাংলাদশকে বলেছেন, সংসদ সংক্রান্ত যেসব বিষয়ে গণভোট হচ্ছে, সেগুলো বিএনপি বহু আগেই ২০১৬ ও ২০২৩ সালে ৩১ দফার মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, বিএনপি সব সময় সংস্কারের পক্ষে ছিল, আছে এবং থাকবে। সংস্কার বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের অংশ এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে ‘না’ বলার কোনো কারণ নেই।
অন্যদিকে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দল-মত নির্বিশেষে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গণভোটে যদি কোনোভাবে ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হয়, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থান, জুলাই সনদ এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রক্রিয়া বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তার মতে, এই গণভোট ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শন ও পরবর্তী সংসদে রাষ্ট্রকাঠামো নির্ধারণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক প্রধান আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে ‘না’ জয়ী হওয়ার কোনো আশঙ্কা তিনি দেখছেন না। তার ভাষ্য, দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনে ফিরতে চায় না।
তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রচারণা শুরু করেছে এবং রাজশাহী ও বরিশালে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। রাষ্ট্র সংস্কারই এই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেই লক্ষ্যেই ১১টি কমিশন গঠন করা হয় এবং কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই সরকার গণভোটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।


