আগাম নির্বাচনেও বড় জয় পেয়েছে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন জোট। রোববার ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, তাকাইচির লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩১৬টিতে জয় পেয়েছে। এটি জাপানের জাতীয় নির্বাচনের ইতিহাসে দলটির সর্বোচ্চ সাফল্য।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এই জয়ের মধ্য দিয়ে তাকাইচির মন্ত্রণালয়ের নেওয়া করছাড় ও নিরাপত্তা জোরদারের মতো বিতর্কিত নীতি বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হলো। তবে এলডিপির জয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে চীন। টোকিও-বেইজিং উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। বৈশ্বিক অর্থ বাজারেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রক্ষণশীল নেতা তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজেকে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের আদর্শে অনুপ্রাণিত বলে উল্লেখ করেন। এবারের নির্বাচনে জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টিকে (ইশিন) সঙ্গে নিয়ে তাকাইচির নিয়ন্ত্রণে এসেছে মোট ৩৫২টি আসন। এতে পার্লামেন্টে তিনি দুই-তৃতীয়াংশের ‘সুপারমেজরিটি’ অর্জন করেছেন।
ফলে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে এলডিপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও তিনি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই কক্ষের সিদ্ধান্ত অতিক্রম করতে পারবেন।
এর আগে তাকাইচির পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবার সময় গত ১৫ মাসে এলডিপি সংসদের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। তাকাইচি ক্ষমতায় এসে সেই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটান।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তাকাইচি তরুণ ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন। তাকে ঘিরে ‘সানাকাতসু’ নামে এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, যার অর্থ ‘সানায়ে-মানিয়া’ (জাপানের জেন জি প্রজন্মের ভাষায় ভক্তি, অনুসরণ ও জনপ্রিয়তা)। পার্লামেন্টে তিনি যে ধরনের হ্যান্ডব্যাগ ও গোলাপি কলম ব্যবহার করেছেন, দেশজুড়ে সেসবের চাহিদাও কয়েকগুন বেড়ে গেছে।
৬৪ বছর বয়সী সানায়ে তাকাইচি গত বছরের শেষ দিকে জাপানের মসনদে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন এলডিপির নেতা নির্বাচিত হন। দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। সেই জনপ্রিয়তার ভিত্তিতেই তিনি জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিরল ‘শীতকালীন আগাম নির্বাচনের’ ঘোষণা দেন।
রোববার ভোটের দিন দেশটির বিভিন্ন এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়। বরফে ঢেকে যায় রাস্তাঘাট। যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং কিছু ভোটকেন্দ্র আগেভাগেই বন্ধ করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। তবুও জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আগাম নির্বাচনে ভোট দিতে আসে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তাকাইচি বলেন, ‘বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের প্রশ্নে এই আগাম নির্বাচন ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজস্ব নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা নীতি শক্তিশালী করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।’ এসব নীতির বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে প্রবল বিরোধিতা থাকলেও জনগণের সমর্থন পেলে সেগুলো বাস্তবায়নে তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে তাকাইচি খাদ্যপণ্যে আট শতাংশ কর স্থগিত করার ঘোষণা দেন। তার দাবি, এতে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা পরিবারগুলো উপকৃত হবে। তাকাইচি বলেন, ‘ভোগকর ছাড়ের বিষয়টি দ্রুত বিবেচনায় নেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজস্বের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিও গুরুত্ব দেব।’
তবে এই প্রতিশ্রুতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানের সরকারি ঋণের বোঝা সবচেয়ে বেশি। এমনকি প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তাকাইচির ভূমিধস জয়ে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ নীতির প্রশংসা করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আগাম নির্বাচন ডাকার মতো সাহসী সিদ্ধান্তই তাকাইচিকয়ে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।’ আগামী মাসে তাকাইচিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে এই জয় চীনের জন্য অস্বস্তিকর। ক্ষমতায় আসার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাকাইচি তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় সমর্থন জানান। এতে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিরোধে জড়ায় টোকিও-বেইজিং। চীন পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে নিজ দেশের নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিংও তাকাইচির বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই জয় জাপান ও অঞ্চলের অংশীদারদের জন্য আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে।’
এ ছাড়া তাকাইচির শক্তিশালী ম্যান্ডেটের কল্যাণে জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায়ও বেইজিংয়ের অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চীন মূলত তাকাইচির এ ম্যান্ডেটকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সামরিক শক্তি পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা হিসেবে দেখছে।


