দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা আর নানা সংশয় কাটিয়ে অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে যাচ্ছে। নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে। সেই প্রস্তুতির ভিত্তিতে বুধবার অথবা বৃহস্পতিবার এই তফসিল ঘোষণা করবে ইসি।
বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এই তফসিল ঘোষণাকে দেশের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মূলধারায় নিয়ে আসতে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন বলেও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান আল মাছউদ মঙ্গলবার জানিয়েছেন, সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত হওয়ার পর তফসিল ঘোষণার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বেতারে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাক্ষাৎ শেষে বুধবার সন্ধ্যায় অথবা বৃহস্পতিবার এই তফসিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রের সংস্কার এবং দ্রুত সংসদ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ শুরু করে। এই লক্ষ্যে সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে এবং গণহত্যার বিচার শুরু করে। বাকি ছিল নির্বাচন আয়োজন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বসে প্রথমে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ এবং পরবর্তীতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরি করে। যদিও সনদ নিয়ে কয়েকটি বিষয়ে অনৈক্য ছিল, তবুও গত ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগই তাতে স্বাক্ষর করে। তবে, এই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সংসদ নির্বাচনের দিনই সনদ বাস্তবায়নে জনমত জানতে গণভোট হবে।
ঐকমত্য কমিশন গঠনের পর থেকে ১০ মাসেরও বেশি সময় ধরে সংস্কার কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ব্যাপক বিভাজন তৈরি হয়।
একই সঙ্গে, রাজধানীতে বিভিন্ন দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন চলতে থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল।
সরকারের সামনে তফসিল ঘোষণার আগে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নির্বাচন ও গণভোটের বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা, গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দৃশ্যমান করা এবং নির্বাচন উপযোগী স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো কিছুটা দুর্বল। তা সত্ত্বেও, সরকার দেশে একটি নির্বাচনী আমেজ সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও ভোটের মাঠে নেমে পড়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) তফসিলের আগে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ‘আমাদের সব প্রস্তুতি শেষ। তফসিল ঘোষণার পর আইন অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগসহ প্রায় ২০টির মতো পরিপত্র জারি করা হবে।’
তফসিল ঘোষণায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ভোটের মাধ্যমে দেশ দীর্ঘদিন পর গণতন্ত্রের মূলধারায় ফিরবে। স্থিতিশীলতাও ফিরে আসবে। অন্যদিকে, জামায়াতের সহকারী জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, তফসিল ঘোষণা ইতিবাচক হলেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তফসিলের পর পরিস্থিতি ভালো হবে।


