বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হয়েছে। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তোলাই এখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের একমাত্র পথ বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
নির্বাচনের আগে বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ক্ষমতায় গেলে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করবে এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবে। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কর্মসংস্থান বাড়াতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কাজ শুরু করেছে।
তবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির এই চেষ্টা দেশে নতুন নয়। এক দশকেরও বেশি সময় আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০১০ সালে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর মানোন্নয়ন, শিক্ষক ও ল্যাব সংকটের সমাধান এবং শিল্প-কারখানার উপযোগী স্নাতক তৈরির লক্ষ্যে ‘স্কিলস অ্যান্ড ট্রেনিং এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট’ বা স্টেপ চালু করা হয়। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের এই প্রকল্পটি দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুনে শেষ হয়। এর আগে ‘স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ বা এসডিপি নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে তা থমকে গিয়েছিল।
২০১৯ সালে ‘স্টেপ’ প্রকল্পের আংশিক সাফল্য ও উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ সত্ত্বেও এর দ্বিতীয় পর্যায় আর শুরু হয়নি। পরিবর্তে ২০২১ সালের জুলাইয়ে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি ‘অ্যাকসেলারেটিং অ্যান্ড স্ট্রেন্থেনিং স্কিলস ফর ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন’ বা অ্যাসেট প্রকল্প শুরু হয়। করোনা মহামারি এবং জনবল সংকটের কারণে প্রায় তিন বছর দেরিতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পতনের পরবর্তী উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে এই কাজে আবারও স্থবিরতা নেমে আসে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে অ্যাসেট প্রকল্পের কার্যক্রম আবারও পূর্ণ গতিতে শুরু হয়েছে। বর্তমানে দেশজুড়ে বেকার যুবক, নারী ও সুবিধাবঞ্চিতদের বিনামূল্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের উপবৃত্তিও প্রদান করা হচ্ছে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দুই লাখ ৩৩ হাজার ৬৬০ জন প্রশিক্ষণ শেষ করে সনদ পেয়েছেন এবং সমপরিমাণ মানুষ বর্তমানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রশিক্ষণ শেষ করার তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থী কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারছেন।
অ্যাসেট প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে এর মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং বিশ্বব্যাংকও এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশ জনমিতির সুবিধার (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) যুগে প্রবেশ করেছে, যা প্রায় দুই দশক স্থায়ী হবে। এই সময়ে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশই কর্মক্ষম। তবে এই সুযোগ কাজে লাগানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে সতর্ক করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটির প্রধান ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ।
তিনি বলেন, পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ বছর তরুণরাই জনসংখ্যার প্রধান অংশ থাকবে এবং জনমিতির সুবিধা নেওয়ার এটাই শেষ সুযোগ। এই সময়ের মধ্যে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল করতে পারলে অর্থনীতি ব্যাপকভাবে লাভবান হবে।
অধ্যাপক মনজুর সাধারণ বিদ্যালয়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার পুরনো ব্যর্থ চেষ্টার পরিবর্তে বিশেষায়িত কারিগরি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং শিল্প-ভিত্তিক ইন্টার্নশিপ চালুর ওপর জোর দেন।
তবে কারিগরি শিক্ষা খাতে এখনো কিছু পুরোনো সমস্যা বিদ্যমান। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, দক্ষ শিক্ষক এবং আধুনিক ল্যাবরেটরির অভাব কারিগরি পাঠ্যক্রমের পূর্ণ বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যাগুলোর সমাধান না করে শিল্প-উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরি করা কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত দক্ষ জনবল তৈরিতে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বর্তমানে অ্যাসেট প্রকল্পের অধীনে ১৯২টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই লাখ তিন হাজার মানুষকে তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে মিলে আরও দুই লাখ ২২ হাজার ৫০০ জনকে কর্মস্থল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই কিন্তু হাতে-কলমে কাজ জানেন, এমন এক লাখ ২৩ হাজার মানুষকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সনদ দেওয়া হচ্ছে। এই সনদ বিদেশের বাজারে, বিশেষ করে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে চাকরির জন্য এখন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ শাহীন জানান, সনদপ্রাপ্ত কর্মীদের বিদেশে ভালো বেতন ও কাজের সুযোগ অনেক বেশি।
অ্যাসেট প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক রবীন্দ্র নাথ মাহাতো জানান, তাদের কাজ শুধু প্রশিক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানজনক পেশা বা আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত হতেও সহায়তা করছেন। এ ছাড়া ডিপ্লোমা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়নে অনুদান দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রকল্পে প্রশিক্ষণের ধরনেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বল্পমেয়াদি কোর্সে বেশি আগ্রহী হলেও বেকার ও সুবিধাবঞ্চিতরা কর্মস্থল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণে বেশি অংশ নিচ্ছেন। অনেক প্রশিক্ষণার্থী নিজেরা ব্যবসা শুরু করে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করছেন।
কারিগরি শিক্ষার প্রশিক্ষণ মূল্যায়ন বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আজহারুল হক মনে করেন, সঠিক বাস্তবায়ন হলে এই কর্মসূচি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী, অ্যাসেট প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং দেশ জনমিতির সুবিধার পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারবে। তবে সবকিছুর মূল চাবিকাঠি এখন সময়ের সঠিক ব্যবহার।


